পুরান ঢাকার আব্দুল আজিজ লেনে আলোচনা সভা, ইফতার ও দোয়া মাহফিল

Date: 2025-03-21
news-banner

 

আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):

 

গতকাল (১৯ রমজান) বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরান ঢাকা লালবাগের আব্দুল আজিজ লেনে এক আলোচনা সভা, ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ২৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলহাজ্ব আব্দুল আজিজ তাঁর স্নেহের ছোট ভাই মৃত: মো. শাহিন, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দেলনে নিহত শহীদদের স্মরণে নিজ বাস ভবনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করেন। পরে বাস ভবন সংলগ্ন আব্দুল আজিজ লেন জামে মসজিদে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

 

আলহাজ্ব আব্দুল আজিজের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা কলেজের সাবেক ভিপি. ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-যুব বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২২ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম-আহ্ববায়ক আলহাজ্ব মজিবর রহমান মজু এবং ২৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি মীর আশরাফ আলী আজম।

 

আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্যে অনুষ্ঠান আয়োজক আব্দুল আজিজ আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, আজকের এই দিনেই আমার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তখন আমার বয়স ছয় এবং আমার ছোট ভাই শাহিনের বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস। আমরা আমাদের দাদী-নানীর কাছে মানুষ হয়েছি। তিনি বলেন, আপনারা জানেন যে, পরবর্তীকালে “১৯৯৪ সালের ৩১ জানুয়ারি এই এলাকায় একটি হত্যাকান্ড ঘটেছিল। কিন্তু এই হত্যান্ডের নেপথ্যে কে? আপনারা জানেন না। এই হত্যাকান্ডটি একমাত্রই ছিল রাজনৈতিক কারণ এবং শেখ হাসিনার একটি টার্গেট। শেখ হাসিনা এই হুমায়ুনকে (সাবেক কাউন্সিলর ২৩ নং ওয়ার্ড) দিয়ে একটি পরিকল্পনা করে এই হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছিল। আর যার কারণে হুমায়ুন পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারন সম্পাদকের পদটি অলংকৃত করেছিল। তার পর তিনি ’আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেল’ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল। যার ইতিহাস আপনারা জানেন না।” সাবেক এই কাউন্সিলর অভিযোগের সুরে বলেন, “মিউনিসিপ্যালিটির কোনো একটি মার্কেটে তার দোকান নেই, এটি বিশ্বাস করা যায় না। ঢাকা শহরে রাজউকের জমি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাড়িঘর করেছে। আপনারা জানেন যে, নওয়াবগঞ্জ বাজার ও বেড়িবাধ সে চুষে খেয়েছে। বিভিন্ন ধরণের স্ট্যান্ড থেকে স্ট্যান্ডবাজি করে খেয়েছেন। এই হুমায়ুন তার আত্মীয়-স্বজন কাউকেই বাদ রাখেননি, সবাইকেই একটা পজিশনে নিয়ে গেছেন।”

 

এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তোমরা পজিশনে গেলা আর আমরা ফকির হয়ে গেলাম, আমরা জেল খাটলাম। আমার এক ভাই সেই ১৯৯৪ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত জেলখানায় ফাঁসির পরোয়ানা নিয়ে ঝুলছে, আর এক ভাইকে কারাগারের হাসপাতালে পরিকল্পিতভাবে মারা হয়েছে। এমনি করে আমাদের বাড়ি-ঘর যা কিছু ছিল, সব কিছু লুটপাট করে নিয়েছিল। আমাদের সহকর্মী যারা ছিল, ওদেরও বাড়ি-ঘর লুটপাট করেছে এবং মোটা অংকের টাকা নিয়েছে, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আপনারা জানেন, আমার বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত ছিল না, এমনকি ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং গুলোও তারা খুলে নিয়ে গিয়েছিল। টাকা-পয়সা, কোটি কোটি টাকার সম্পদ আমার নষ্ট করে দিয়েছে। আমার দোকানও তারা আত্মসাৎ করেছে। এমনিভাবে হুমায়ুন আমার সাথে যা করেছে, এরকম হাজারো লোকের সাথে করে আজ সে পুঁজিপতি। এবং তার সাথে সঙ্গীয় কিছু লোক ছিল তারাও এই লুটপাটে অংশ গ্রহন করেছে। যারা রাস্তায় কাঁচা মরিচ বিক্রি করত, আজকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে।” তিনি বলেন, “রাতারাতিতো আর কোটি কোটি টাকার মালিক কাঁচা মরিচ বেচে হওয়া যায় না। লুটপাট করেই হওয়া যায়।” পরিশেষে দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়িত সাবেক এই কাউন্সিলর মঞ্চে উপবিষ্ট নেতৃবৃন্দের কাছে উদাত্ত আহ্ববান জানিয়ে বলেন, স্বৈরাচারি ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর “নরপিশাচ, হত্যাকারী ও খুনি এই হুমায়ুনের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, তার যেন ফাঁসি হয়। যাতে করে এলাকার মানুষজন যেন বুঝতে পারে যে, অন্যায় করলে তার পরিনতি কী হয়।”

 

বিশেষ অতিথি আলহাজ্ব মজিবর রহমান মজু বলেন, “আজিজ ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৮ সালে। ঐ সময় তাঁকে চিনতাম একজন সৎলোক হিসেবে, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে এবং একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে। এই লোকটাকে ও তার পরিবারের লোকজনকে একটা মিথ্যা মামলায় জড়াইয়া তাঁর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনসহ তাদের পুরো পরিবারটিকে শেষ করে দিয়েছে।” এ সময় ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই, খুনি হুমায়ুনের ফাঁসি চাইসহ বিভিন্ন শ্লোগানে পুরো পরিবেশ বিক্ষোভ-মূখর হয়ে ওঠে।   

 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মীর নেওয়াজ আলী তাঁর পূর্ববর্তী বক্তা মজিবর রহমান মজুর বক্তব্যের সূত্র ধরে বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা শুধুমাত্র আব্দুল আজিজ ভাই ও তাঁর পরিবারের উপরই নির্যাতন চালায়নি। তারা দীর্ঘ ১৭ বছর এ দেশের মানুষের উপর কী পরিমাণ জুলুম করেছে, নির্যাতন করেছে তা মানুষ দেখেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনকি বিচার বিভাগকে পর্যন্ত ধংস করে দিয়েছে। পাট শিল্পসহ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আমাদের পুরান ঢাকার চামড়া শিল্পকে ধংস করে দিয়েছে। কোনো কিছুই তারা রাখেনি, শিক্ষা-ব্যবস্থাকেও তারা ধংস করে দিয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলমান, আমাদের ব্যক্তি জীবনে আত্মশুদ্ধির জন্য ’তাবলিগ’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিভাবে শুদ্ধরূপে নামাজ পড়া যায়, নামাজের গুরুত্ব ও জীবন ব্যবস্থার গুরুত্ব এগুলো ’তাবলিগ’ থেকে শেখা যায়। ২০১৮ সালে এই ’তাবলিগ’কে বিভাজন করা হল।” তিনি আরও বলেন, “উদ্দেশ্যমূলকভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাইদেরকে সংখ্যা লঘুর কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হল। যাতে সারা জীবন তারা ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে। দেশের মানুষ যেন কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে সেই চেষ্টাই তারা করে গেছে। কিন্তু আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না।”

 

প্রধান অতিথি আরও বলেন, “একটি দল রয়েছে, যখন যেখানে সুবিধা পায়, তাদের উপর ভর করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এখনো ছোট ছোট বাচ্চাদের উপর ভর করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে। আরে ভাই! ভোটই চাইতে পারেন না আপনি, আপনার কমিটি নাই, সংগঠন নাই, এখনো সর্বহারার মতন অপনারা যে দল পরিচালনা করেন; আপনার পার্টির প্রেসিডেন্ট কে? সেক্রেটারি কে? এদেশের মানুষ জানেনা। আপনি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছেন, ষড়য়ন্ত্র করছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করবেন! ভাই এগুলা আর কইরেন না। আর রক্তক্ষরণ এদেশের মানুষ দেখতে চায় না। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। আজকে দেখেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে আজকে টিসিবিতে লাইন ধরে মানুষ খাবার সংগ্রহ করছে। সেটা বাংলাদেশে হবার কথা ছিল না। যারা খাবার সংগ্রহ করছে, তারা আপনার মত আমাদের মত লোক। তারা কেউ ঘোমটা দিয়ে রাখছে, কেউ মাক্স পড়ে থাকছে, কেউ গামছা পেঁচিয়ে রাখছে লজ্জা নিবারণ করার জন্য। এইটা বাংলাদেশের মানুষ চায়নি। মুক্তিযোদ্ধারা এগুলো দেখার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেননি। তঁরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। সুতরাং দেশের বিরুদ্ধে এবং দেশের বাহিরে অনেক ষড়যন্ত্র চলছে। নিশ্চই আপনারা বুঝতে পারছেন।” তিনি আরও বলেন, “এ দেশ একার বিএনপির নয়, এ দেশ ১৮ কোটি মনুষের দেশ। এবং আলেম-ওলামা, ওলি-আওলিয়ার দেশ। এ দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবে! এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবে! যেখানে ৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশ, সেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সজাগ থাকতে হবে এবং আগামী দিনে আমাদের যে জনগণের ভোটের অধিকার, সেটিকে প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যদি প্রয়োজন হয়, আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হবে। জনগণের যে ভোটের অধিকার, আমরা প্রতিষ্ঠা করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।”

 

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সাথে কোতয়ালী থানা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম-আহ্ববায়ক আব্দুল আজিজ শাহাবুদ্দিনসহ কোতয়ালী থানা সেচ্ছাসেবক দলের নেতৃবৃন্দ, তাঁতী দলের রফিক, ২৬ নং ওয়ার্ড সেচ্ছাসেবক দলের আহ্ববায়ক তারেক হোসেন রাজু, ২৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি মো. জুম্মন ও আজিমপুর বটতলা ইউনিট বিএনপি সভাপতি আরমান হোসেন বাদলসহ লালবাগ থানা বিএনপির অন্যান্য নেতা-কর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ইফতার পূর্বে স্থানীয় জামে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। 

Leave Your Comments