ভারতে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কৌশলগত সম্পর্ক অটুট থাকলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভারতীয় জনমতে নতুন ধরনের অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ, মার্কিন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Deutsche Welle–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী ও হিসাবনির্ভর হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump সামাজিক মাধ্যমে ভারত প্রসঙ্গে বিতর্কিত মন্তব্য শেয়ার করেন। ‘দ্য স্যাভেজ নেশন’ নামের একটি রেডিও অনুষ্ঠানের অংশ শেয়ার করে সেখানে ভারতের প্রসঙ্গে “হেলহোল” বা “নরকের মতো জায়গা” শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মন্তব্যকে “অজ্ঞতাপূর্ণ, অনুপযুক্ত ও রুচিহীন” বলে মন্তব্য করেছে।
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে ঘটনাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি ভারতের অভ্যন্তরে সমালোচনার মুখে পড়ছে।
ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য ভারতীয়দের কাছে অন্যতম প্রধান গন্তব্য। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে ওয়াশিংটন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্কের ভেতরে কিছু চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলার পর ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দাবি করলে নয়াদিল্লি তা ভালোভাবে নেয়নি। ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা গ্রহণযোগ্য নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও উত্তেজনা বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এর একটি কারণ হিসেবে ভারতের রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত পারস্পরিক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সাবেক কূটনীতিক Hemant Krishna Singh এক বিশ্লেষণে বলেন, শুধু ভারতকে লক্ষ্য করে এমন শুল্ক আরোপ সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তার মতে, এতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং জনসমর্থন কমছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, রুপির মান কমেছে এবং শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে ভারতীয় ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্বাধীন সাংবাদিক Karen Rebelo বলেন, ইরান যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আগে যারা ট্রাম্পকে ব্যবসাবান্ধব নেতা হিসেবে দেখতেন, তাদের মধ্যেও এখন নীরব অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
এদিকে ভারতের প্রভাবশালী ইউটিউবার ও অনলাইন ভাষ্যকারদের অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যারা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সমালোচনামূলক অবস্থান নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবুও জনমতের এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কটি এখন আর কেবল আবেগ বা আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করছে না; বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাব–নিকাশে নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।