সাইফুল আজম খান,
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।
🔴 ঘুষের স্বর্গরাজ্যে ওসি নোমান হোসেন
🔴 আইনের রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায়
🔴 মামলার ভয় দেখিয়ে উৎকোচ আদায়
🔴 ওসি নোমানের রয়েছে সক্রিয় সিন্ডিকেট
🔴 অপকর্মের সহযোগী বকশি মাহফুজুর
🔴 দালালদের মাধ্যমে আয় লক্ষাধিক টাকা
🔴 থানায় আটকে রেখে দেনদরবার
🔴 চাহিদা পূরনে ব্যর্থ হলেই মামলা
🔴 পুলিশ আতংকে এলাকার মানুষ
সাতক্ষীরা আশাশুনি থানার ওসি নোমান হোসেন কর্তৃক আ.লীগ নেতা ও ব্যাবসায়ীদের মামলার ভয় দেখিয়ে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ওসি নোমান হোসেন যোগদান করার পর থেকে আইনশৃংখলা পরিস্থতির অবনতি ঘটেছে। এলাকায় সাধারণ মানুষ রয়েছে মামলা ও গ্রেফতার আতংকে। বেড়েছে মিথ্যা মামলার প্রবণতা ও আটক বানিজ্যের প্রাদুর্ভাব। ওসি নোমান হোসেনের রয়েছে একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন আ.লীগ নেতা এবং ব্যাবসায়ীদের নামের তালিকা করা হয়। এরপর ওসির বিশ্বস্ত দালালদের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিদের তার্গেট করা হয়। অভিযোগ আছে, তার্গেটকৃত ওইসব ব্যক্তিদের বিভিন্ন মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে দালালদের মাধ্যমে মাসোহারা নেয় ওসি নোমান হোসেন। আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ নোমান হোসেন এর (বিপি নং ৮৪১১১৪৫১৪৯)। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, আশাশুনিতে রফিক নামের একজন ব্যক্তি ওসি নোমান হোসেনের বিশ্বস্ত একজন দালাল। এই দালালের মাধ্যমে আশাশুনির বিভিন্ন এলাকা থেকে আ.লীগ ও বিভিন্ন ব্যাবসায়ীদের নিকট থেকে লক্ষাধিক টাকার মাসোহারা নেয় ওসি নোমান হোসেন। যদিও রফিক নামের ওই ব্যক্তি পেশায় একজন মটর সাইকেল চালক। আশাশুনি থানার বকশি মাহফুজুর রহমান এর মাধ্যমে বিভিন্ন আ.লীগ নেতা কর্মীদের নিকট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নেওয়ার তথ্য রয়েছে। বকশি মাহফুজুর রহমান এর বিপি নং ৮১০০০০৪৩৯২। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, সাতক্ষীরা, আশাশুনি, ব্যাংদহা শরাফপুর গ্রামের বাসিন্দা ও জেলা আ.লীগের কোষাধ্যক্ষ রাজ্যেশ্বর বাবুর নিকট থেকে দালাল রফিক এর মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ নেন ওসি নোমান হোসেন। এছাড়া আশাশুনি, শ্রীউলা ইউপি চেয়ারম্যান দীপঙ্কর বাছাড় দিপুর কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা সহ তার নিকট থেকে একটি ১২ সেফটির ওয়ালটন ব্রান্ডের ফ্রিজ ওসিকে দেওয়ার কথা বলে নেন দালাল রফিক। চেয়ারম্যান দীপঙ্কর বাছাড়ের নিকট থেকে নেওয়া ফ্রিজ থানায় রাখার বিষয়টি বিভিন্ন মহলে সরব হওয়ায় পরবর্তীতে ওসি নোমান থানা থেকে অন্যাত্রে সরিয়ে রাখে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। আশাশুনি উপজেলার মানিকখালি, বিসমিল্লাহ হ্যাচারির মালিক গাউসুল হোসেন রাজ এর নিকট থেকে ২ লক্ষ টাকা বকশি মাহফুজুর রহমান এর মাধ্যমে নেন ওসি নোমান হোসেন। আশাশুনি কুদ্দুস চেয়ারম্যানের নিকট থেকে ৬ পিস পাতাড়ি মাছ ও মধু নেওয়া হয়। আশাশুনি, বুধহাটা ইউপি চেয়ারম্যান ডাবলুর নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা বকশির মাধ্যমে নেন ওসি। আশাশুনি উপজেলার, শ্রীউলার কোহিনুর হাজীর নিকট থেকে ২ লক্ষ টাকা ঘের সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বকশীর মাধ্যমে ঘুষ নেন ওসি। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি ওসির ঘুষ নৈরাজ্য। রীতিমতো সাতক্ষীরা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও আশাশুনি, আনুলিয়া ইউনিয়নের কাকবাসিয়া গ্রামের ড. শিহাব উদ্দিনের নিকট থেকে নগত ৩০ হাজার টাকা, পাঁচ কেজি পারশে মাছ, দুই পিস বড় ভেটকি মাছ, ২ কেজি মধু নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওসি নোমান হোসেন এর পক্ষ থেকে শিহাব উদ্দিন এর নিকট ফের ৫ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, ওসি নোমান হোসেন ভুক্তভোগী শিহাব উদ্দিনের প্রতিপক্ষের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ড. শিহাব উদ্দিনকে গ্রেফতার করে। আশাশুনি, খাজরা ইউপি মেম্বার বিপ্লব এর নিকট থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করার একপর্যায় ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ভুক্তভোগী রেহাই পায়। খাজরার সোহেল নামের এক ব্যক্তির ঘের ও বাড়ি দখল করে দেবে বলে অগ্রিম ২৫ হাজার টাকা নেন ওসি নোমান হোসেন। শ্রীউলা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা শাকিল এর কাছ থেকে ৮ লক্ষ টাকা নেন ওসি। ওসি নোমান হোসেন কে ৮ লক্ষ টাকা দিয়েও রেহাই পায়নি আবু হেনা শাকিল। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল কে ইতিপূর্বে ধরে এনে চালান দেওয়া হয়েছে। আশাশুনি উপজেলা আ.লীগের সহ-সভাপতি ও বুধহাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব আ,ব,ম মোসাদ্দেক কে থানায় ধরে নিয়ে প্রতাপনগর ইউনিয়ন জামায়াতের নেতাকর্মী হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অংকের টাকার দেনদরবার হয়। এ সময় আটককৃত মোসাদ্দেক কে অন্য একটি মামলায় আসামি ভুক্ত করে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া ওসির বিশ্বস্ত দালাল রফিকের হাতের লেখা কয়েকটা তালিকা এই প্রতিবেদকের হাতে আসে। তাতে লেখা আছে কোন ব্যক্তির নিকট থেকে কত টাকা মাসোহারা নেওয়া হয়। তালিকায় রয়েছে, শহিদুল সিদুলপুর-১০, আরিফ মহিষকুড়-১০, মিলন মেম্বার মহিষকুড়-৫, কবির কাকবাশিয়া-১০, রুহুল আমিন পাইথালি-১০, কাপসন্ডা আরব আলী মেম্বার-৫, আইজুল চম্পাফুল-১০, মনিরুল মেম্বার শ্রীধারপুর-১০, বাসারত বুধহাটা-৫, রিপন মালিক কাদাকাটি-৫, মহেশ্বর কাটি-১০, কোনার বাঁকড়া-৫, অ্যালমনিয়াম দোকান-১, আরেজ মোড়ল, জাকির, বিছট ৩টি দোকান, কল্যাণপুর ৪টি দোকান, গোয়ালডাঙ্গা ৩টি দোকান, বুধহাটা ২টি দোকান, আশাশুনি ২টি দোকান, হেলাল, শাহিনুর, রশিদ, খোকন, মিজানুর, তুহিন, সুমন, হাবিবুর ও জাহাঙ্গীর গংদের নাম। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ব্যক্তির মোবাইল নম্বর তালিকায় আছে আবার কিছু সংখ্যক ব্যক্তির মোবাইল নম্বর দেওয়া নেই। এদিকে, ঘুষের রাজত্ব কায়েম করছেন ওসি নোমান হোসেন। তার দাবিকৃত টাকা না দিলে মিথ্যা ভাবে নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হচ্ছে নাশকতা, হত্যা সহ অন্যান্য মামলায়। ফলে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পুলিশ আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এ বিষয় অভিযুক্ত রফিক এর সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন মানুষের নিকট থেকে ৮ লক্ষ টাকা তুলে আশাশুনি থানার ওসিকে দেওয়ার অভিযোগ এনে সার্কেল এসপি স্যার, অফিসে ডেকে জিজ্ঞাসা বাদ করেন। আমি অভিযোগ অস্বীকার করে বলি কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। একপর্যায় সার্কেল এসপি স্যার, আমাকে তার চোখের সামনে থেকে চলে যেতে বলেন। সেই থেকে আমি আর আশাশুনি থানায় যায়নি। এ বিষয় আশাশুনি থানার বকশি মাহফুজুর রহমান এর সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা। কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। এ বিষয় আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ নোমান হোসেন এর সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে সাংবাদিকের পরিচয় পেতেই তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এ বিষয় সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম মুঠোফোনে আলাপকালে বলেন, ঘুষ নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।