নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে এক অনন্য দৃশ্য—শিশুরা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছে, আর তাঁদের মায়েরা বসে কাঁথায় নকশা তুলছেন। সাঁওতালি ও মাহালি ভাষায় গল্প করতে করতে তাঁরা সেলাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আয় দিয়েই চলছে স্থানীয় বিদ্যালয় ‘শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন’।
বিদ্যালয় ও কর্মসংস্থানের এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন সুমী মুর্মু। তিনি গড়ে তুলেছেন নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা। বাইরের কোনো তহবিল ছাড়াই নারীদের হাতের কাজের আয় দিয়েই সংস্থার ব্যয় মেটানো হয়। বর্তমানে ১৭২ নারী যুক্ত হয়েছেন এই কাজে। কেউ নকশিকাঁথা সেলাই করেন, কেউ ব্লক প্রিন্ট, কেউ আবার কাঁথা পরিষ্কার ও ইস্তিরি করে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত করেন।
নকশিকাঁথার বৈচিত্র্য
সংস্থার সদস্যরা এখন প্রায় ৩০০ ধরনের নকশা তৈরি করেন। পদ্ম, শাপলা, গোলাপ, জুঁই ফুলের নকশা ছাড়াও ময়ূরের পেখম, মাছের চলন কিংবা পাখির যুগল চিত্র ফুটে ওঠে কাঁথায়। জ্যামিতিক নকশাও কাঁথাকে দেয় শৈল্পিক ছোঁয়া।
সুমীর সংগ্রাম ও সাফল্য
অভাবের সংসারে বড় হওয়া সুমী মুর্মু এসএসসি থেকে এমবিএ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেছেন নানা বাধা পেরিয়ে। চাকরি করলেও সম্প্রদায়ের নারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যুব উন্নয়ন থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে নকশিকাঁথা তৈরির কাজ শুরু করেন।
বিদ্যালয়ের যাত্রা
ভুগরইল গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় সুমী স্থানীয় গির্জার পাশে পরিত্যক্ত ভবনে স্কুল চালু করেন। বর্তমানে প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা হচ্ছে। শিক্ষক চারজন ও একজন আয়া মিলে পাঁচজন কর্মী রয়েছেন। তাঁদের বেতন ও বিদ্যালয়ের ভাড়া সংস্থার আয় থেকেই দেওয়া হয়। একইভাবে সন্তোষপুর গ্রামেও আরেকটি বিদ্যালয় চালু করেছেন তিনি।
জীবনে পরিবর্তন
সংস্থার নারীরা এখন মাসে সাড়ে তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। ফলে তাঁদের আর মাঠে যেতে হয় না, সন্তানদের পড়াশোনায় সময় দিতে পারছেন। কেউ কেউ বলছেন, আগে সংসারে অভাব ছিল, এখন বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ দিতে পারছেন এবং নিজের ইচ্ছেমতো কিছু কিনতেও পারছেন।