এস আই খান:
অবশেষে চড়া মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট আর ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতির মহাসংকটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকৃতির প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছে বর্তমান সরকার। ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট সাজালেও, দেশের বর্তমান চরম বাস্তবতায় এটি এক প্রকার ‘আকাশকুসুম কল্পনা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপ, সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের খতিয়ান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বড় বড় বুলি দিলেও, এই বাজেট সংকটে জর্জরিত সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে পারেনি। আপাতদৃষ্টিতে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর হ্রাস বা স্বাস্থ্যের বরাদ্দ দ্বিগুণ করার মতো কিছু চমক দেখানো হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ঋণের মরণফাঁদ এবং সাধারণ জনগণের ওপর বিশাল করের বোঝা।
এবারের বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ব্যয় হবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার যে ধার-দেনার পরিকল্পনা করেছে, তা দেশের অর্থনীতিকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকেই সরকার ঋণ নেবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এমনিতেই দেশের ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, তার ওপর সরকার যদি এক বছরে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কোনো ঋণ পাবেন না। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে আরও ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই বিশাল ঋণ ও তার চড়া সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে আগামী প্রজন্মের কাঁধে ঋণের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ঋণের সুদ পরিশোধের খাত। প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা! যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ভাবলে অবাক হতে হয়, একটি দেশের বাজেটের এত বড় একটা অংশ যদি কেবল অতীতের ঋণের সুদ দিতেই চলে যায়, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতের প্রকৃত উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব? এটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, সরকার এখন ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’র নীতিতে এগোচ্ছে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ করদাতাদের।
বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের এক অসম্ভব ও আগ্রাসী লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল টাকা আদায়ের জন্য এনবিআর স্বভাবসুলভভাবেই সাধারণ জনগণের ওপর পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের বোঝা চাপাবে।
যদিও অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন যে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, কিন্তু অন্যদিক থেকে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার সব বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। ব্যাংকিং লেনদেনে কড়াকড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করা এবং খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আগাম কর আরোপের মতো সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। যেখানে সাধারণ মানুষ বাজারের আগুনে পুড়ছে, সেখানে করের আওতা ধনীদের দিকে না বাড়িয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর চাপানো চরম বৈষম্যমূলক।
বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা নিছক একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।
যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম চড়া, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত এবং বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ, সেখানে কোন জাদুমন্ত্রে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামবে, তার কোনো বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ বাজেটে নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি না মেনে সরকার যখন নিজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করবে, তখন বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি কমার বদলে আরও লাগামহীন হয়ে পড়বে।
বাজেটে এবার স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা (জিডিপির ১.০২%) করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য কার্ড চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি শুনতে ভালো লাগলেও অতীতে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চরম প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে বরাদ্দের একটা বড় অংশ বছর শেষে খরচই করা যায় না। দক্ষ জনবল ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে কেবল বরাদ্দ বাড়ানো আমলাতান্ত্রিক লুটপাটের নতুন সুযোগ তৈরি করবে মাত্র।
অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রকৃত অর্থে গত বছরের চেয়ে কমেছে। কৃষক কার্ড ও ভর্তুকির কথা বলা হলেও সার, বীজ ও সেচের উপকরণের চড়া দামের কারণে কৃষকরা কতটা সুফল পাবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
অপরাধ ও প্রশাসনিক খাতের গভীরে তাকালে দেখা যায়, বিগত আমলের পাচার হওয়া লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে এই বাজেটে কোনো জোরালো আইনি বা আর্থিক কৌশলের প্রতিফলন নেই। ব্যাংকিং খাতের বড় বড় খেলাপি ঋণ আদায় বা আর্থিক অপরাধীদের দমনে এনবিআর কিংবা শুল্ক গোয়েন্দাদের শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দ বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। প্রশাসনিক সংস্কারের নামে কেবল ‘ডি-রেগুলেশন’ বা লাইসেন্সের মেয়াদ ৫ বছর করার মতো কিছু আইনি শিথিলতা আনা হয়েছে, যা মূলত বড় বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেবে, কিন্তু ক্রাইম বা আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে না।
সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট সংকটে পড়া দেশের অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেয়ে বরং আরও বেশি চোরাবালিতে আটকে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এটি একটি উচ্চাভিলাষী, ঘাটতি-নির্ভর এবং সাধারণ মানুষের জন্য করের বোঝা বাড়ানো বাজেট। একটি জবাবদিহিতামূলক কল্যাণ রাষ্ট্রে বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার সিন্ডিকেট দমন এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু বর্তমান সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার না করে কেবল সংখ্যার যে বিশাল ইমারত খাড়া করেছে, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের প্রশাসনিক যন্ত্রের নেই। ফলে এই ফাঁপা বাজেট শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবেই আবির্ভূত হবে।