গণহত্যায় দণ্ডিত কেউ ফেরেনি, শেখ হাসিনার পথও তবে রুদ্ধ?

Date: 2025-11-20
news-banner

ঢাকা: ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, কোনো শাসক যদি গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হন, তবে ক্ষমতার মসনদে ফেরার পথ তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। অন্তত ৪৮ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে ছিল স্বৈরাচারী শাসন, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ। তবে তাদের সবাইকে দণ্ডিত করা হয়নি কার্যকরভাবে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ৩৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, বাকিরা হয় দেশ ত্যাগ করেছেন, কেউ আবার আপিলের মাধ্যমে সাজা কমিয়েছেন।

এদিকে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৫৮৬টি মামলা আছে, যার মধ্যে ৩২৪টি হত্যা মামলা এবং ৬টি দুর্নীতি মামলার অন্তর্ভুক্ত। ইতিমধ্যেই একটি হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাসে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত নেতারা ক্ষমতায় ফেরেননি। এরশাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তিনি পতনের পর জেলে থাকা সত্ত্বেও ভোটে অংশ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এরশাদের দল জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৩৫টি আসনে জয় লাভ করেছিল। যদিও নানা মামলায় তাকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হয়েছিল, সেনাবাহিনী ও রাজনীতির প্রয়োগে তিনি রাজনৈতিকভাবে আবার সক্রিয় হয়েছিলেন।

তবে শেখ হাসিনার পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঘটানো হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে তখন হাজার মানুষের হত্যার অভিযোগ ওঠে। ডিজিটাল প্রমাণ এবং স্বাক্ষীর ভিত্তিতে এই অভিযোগগুলো জোরদার হয়ে উঠে। এছাড়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তার ও দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, গুম ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ফলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মাঠে প্রত্যাবর্তন পুরনো রূপে সহজ নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ফেরা নির্ভর করবে সামনের দিনে দলের বর্তমান নেতা ও সমর্থকের কার্যক্রম, রাজনৈতিক কৌশল এবং জনগণের গ্রহণযোগ্যতার ওপর। গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “যদি নতুন নেতৃত্ব এবং দলের সমর্থকরা শেখ হাসিনার মতো বা তার চেয়ে খারাপ কাজ করে, তাহলে হয়তো তার ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং তার বয়স মিলিয়ে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।”

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পতনের পর দল এখনও কিছুটা শক্তি ধরে রেখেছে। ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে দলটির সমর্থক সংখ্যা প্রায় ১৯ শতাংশ। তৃণমূল পর্যায়ে কিছু নেতা এবং ক্লিন ইমেজের পেশাজীবী সমর্থক রয়েছেন, যারা দলের কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করতে পারে। তবে অনেক সমর্থক এখন অসন্তুষ্ট এবং দলীয় পুনর্গঠনের অপেক্ষায়।

বিশ্লেষকরা মনে করান, স্থানীয় নির্বাচন ও আসনভিত্তিক সমর্থন ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ পুরনো শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। জামায়াত ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কাছে সুযোগ থেকে যায়, যারা স্থানীয় নির্বাচন ও গণমত ব্যবহার করে জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কাজ ও ফলাফল দেখতে চায়, শুধু কথা নয়। তারা ইতিহাস ও ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতা নির্বাচন করবে। ফলে, আওয়ামী লীগের পুনরুদ্ধার সহজ হবে না। দলকে নতুন কৌশল, ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখনও পরিবর্তনশীল। গণঅভ্যুত্থান, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো—এসবের সমন্বয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে। তবে ইতিহাস এবং জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে তার পুনরাবির্ভাবের পথ সহজ নয়।   


লেখক: সাংবাদিক

ই-মেইল: [email protected]

Leave Your Comments