তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে উপকূলবাসীকে। নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলের মানুষের কাছে সেই রাত মানেই মৃত্যু, ধ্বংস আর স্বজন হারানোর অসহনীয় বেদনা। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’-এর আঘাতে উপকূলীয় জনপদে নেমে এসেছিল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, যার ক্ষত এখনও বহন করছেন বহু মানুষ।
হাতিয়ার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, সেই রাতের কথা মনে পড়লেই এখনও আতঙ্ক ফিরে আসে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আব্দুল মান্নান বলেন, ঝড়ের রাতে চারদিকে শুধু মানুষের আর্তনাদ, জলোচ্ছ্বাস আর মৃত্যু দেখেছিলেন। বহু মানুষ চোখের সামনে ভেসে গিয়েছিল, হারিয়ে গিয়েছিল পুরো পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল হক ও দেলোয়ার হোসেন জানান, ৩৫ বছর পরও সেই ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি তাদের মানসপটে জীবন্ত। তাদের ভাষায়, “সেই রাত ছিল মৃত্যুর রাত। মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কক্সবাজার, মহেশখালী, চকরিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগের ঝড়ো হাওয়া এবং ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে লাখো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই দুর্যোগে প্রাণ হারান ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ। গৃহহীন হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল হাতিয়া, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
এত বছর পরও উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ ও পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। ফলে নতুন কোনো ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় এখনও উদ্বেগে থাকেন স্থানীয়রা।
হাতিয়ার বাসিন্দা ও লেখক ফজলে এলাহী শাহীন বলেন, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় দৃশ্যমান নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তার মতে, কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া উপকূলবাসী এখনও ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নোয়াখালী ইউনিটের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ আজাদ বলেন, অতীতের দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে উপকূলবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও আশ্রয়কেন্দ্র, সচেতনতা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, আগাম সতর্কবার্তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে দুর্যোগে প্রাণহানি অনেক কমেছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।