জগৎ মোহনে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের “যেমন খুশি তেমন সাজো” আয়োজন

Date: 2025-02-18
news-banner

 

আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):

 

“নবীর শিক্ষা, ক’রো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে।” তবুও মানুষ ভিক্ষা করে। কেউ করে অভাবে আবার কেউ করে স্বভাবে। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক খেলাধুলার অংশ হিসেবে “যেমন খুশি তেমন সাজো” পর্বে খুদে শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগীতার মাধ্যমে ডাক্তার, সমাজ-সেবক, কৃষক-রাখাল, ফেরিওয়ালা, গাঁয়ের বধু ও ভিক্ষুকসহ বিভিন্ন সাজে নিজেকে সাজিয়ে ঐ সমস্ত চরিত্রের সহজাত বৈশিষ্টগুলো ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করে। এ সময় ছোট্ট সোনামনিদের এই অনুকরণের অভিনয় দেখে উপস্থিত দর্শক, বিচারক মন্ডলি ও অভিভাবকরা কিছু সময়ের জন্যে হলেও এক অনন্য আনন্দধারায় মনকে ভিজিয়ে নেয়। ওদের মাঝে নিজের শৈশব খুঁজে বেড়ায়।

 

গতকাল (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর লালবাগ থানাধীন জগৎ মোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে এমনই এক “যেমন খুশি তেমন সাজো” অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাথে ছিল অন্যান্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় উত্তীর্ণদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ এবং একই সাথে পিঠা উৎসবের আয়োজন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন লালবাগ থানা শিক্ষা অফিসার জেসমিন আক্তার বানু, থানা শিক্ষা রিসোর্স সেন্টার ইন্সট্রাক্টর জেবুন্নেসা শেলী, সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার ইসরাত আহমেদ, স্বপ্না ঘোষ ও শামীমা আক্তার। বিদ্যালয় প্রধান শেখ মোসাম্মৎ নাসরিন মাহমুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শায়লা রহমান। উৎসবের আমেজে অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সকলের পদচারণায় পুরো বিদ্যালয় জুড়ে এক আনন্দমুখর পরিবেশের তৈরি হয়।

 

বর্তমান বাস্তবতায় সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করায় “যেমন খুশি তেমন সাজো” পর্বে প্রথম শ্রেণির খুদে শিক্ষার্থী রিদওয়ান বিন মামুন এক অসহায় বৃদ্ধ ভিক্ষুকের চরিত্রে অভিনয় করে নতুন বার্তা নিয়ে আসায় অন্যান্য প্রতিযোগীদের পিছনে ফেলে প্রথম পুরষ্কার অর্জন করে নেয়। এই প্রতিযোগীর গল্পের বার্তাটি ছিল এমন; কর্মক্ষমতা হারানো এক বৃদ্ধের একমাত্র পুত্র বিয়ে করে বৃদ্ধের কাছ থেকে যাবতীয় সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাকে অসহায়ভাবে একা ফেলে রেখে বউসহ অন্যত্র চলে যায়। অতীত স্মৃতি হাতরে বৃদ্ধের সারাটাদিন কাটে। সন্ধ্যায় আঁধার নেমে এলে জীর্ণ শীর্ণ শরীর নিয়ে শুয়ে থাকে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হলেও ঘুম আসে না তার; পেটের ক্ষুধায়। সে বহু চেষ্টা করে ঘুমাতে কিন্তু পেটের ক্ষুধা তাকে ঘুমাতে দেয় না। নিরুপায় বৃদ্ধ এক সময় অন্ধকার হাতরে হেরিকেনের আলো জালিয়ে মন্থর গতিতে অলস পায়ে হাঁটতে থাকে। আর ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে হাঁক ছাড়ে, “মা’গো বুড়ারে কয়ডা ভাত দ্যান.. . হারা দিন কিছু খাই নাই, খিদার জ্বালায় ঘুম আহে না, মা’গো বুড়ারে কয়ডা ভাত দ্যান.. .।“

 

ক্ষুদে শিক্ষার্থী রিদওয়ানের বক্তব্য হচ্ছে, “বাবা-মা’য়ের বার্ধক্যে কোনো সন্তান যেন তাদেরকে ছেড়ে না যায়। আর বাস্তবে যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যায়, তাহলে সমাজের সবাই যেন তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। তাদেরকে অন্তত খাবারের ব্যবস্থাটুকু করে দেয়। তাদের যেন শূণ্য পেটে গভীর রাতে খাবারের সন্ধানে বের হতে না হয়। তারা যেন পেটে একটু খাবার দিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। আশেপাশের কোনো প্রতিবেশীর সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলে এই অসহায় বৃদ্ধকে হয়তো খাবারের খোঁজে গুটি গুটি পায়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো না।”

 

মানুষ একাকী বাস করে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল আচররণের মধ্য দিয়ে মানুষকে সমাজে বেঁচে থাকতে হয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমরা অনেক যান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। এ কারনে আমরা কেউ প্রতিবেশীর খোঁজ রাখছি না। অথচ প্রতিবেশীর অধিকার ও মর্যাদার প্রতি ইসলামে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবেশী কারা, এ বিষয়ে হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, নিজের ঘরের চতুর্দিকের প্রতি দিকে ৪০ টি করে মোট ১৬০ টি ঘরের বাসিন্দারা সবাই প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখা ঈমানের দাবি। দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অনটন মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী। এসব দিয়ে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। আবার ধনী-গরীব তাঁরই ইচ্ছায় হয়ে থাকে। তাই দরিদ্র প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে মহানবী (স.) বলেছেন, “ঐ ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় আর তার পাশেই তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।”

 

ভিক্ষবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি স্বীকৃত কোনো পেশা নয়। ইসলামে বৈধ তবে নিন্দনীয় দু’টি কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে “তালাক” এবং অপরটি “ভিক্ষাবৃত্তি।” হাদিসে শুধু তিন শ্রেণির মানুষের জন্য ভিক্ষা করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তারা হলো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যার সব সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেছে তার জন্য ভিক্ষার অনুমতি রয়েছে। তবে যখন প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে, তখন আর ভিক্ষা করা যাবে না। দ্বিতীয় ওই ব্যক্তি, যার সম্পদ কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ভিক্ষা করা যাবে এবং সর্বশেষ ঐ ব্যক্তি, যে একেবারেই নিঃস্ব, এবং তার বংশের তিনজন সাক্ষ্য দেয় যে, সে নিঃস্ব। তার জন্যও প্রয়োজন অনুযায়ী ভিক্ষা করা যাবে (মুসলিম)। কিন্তু কারো জীবনে এ অবস্থা আসার আগেই সমাজে দায়িত্বশীল ও সচেতন মহলের করণীয় রয়েছে। 

Leave Your Comments