মাসুদুর রহমান
খুলনা প্রতিনিধি:
বিদায়ী বছর ২০২৪ সাল জুড়েই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ বছর নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নির্ধারিত ও স্বল্প আয়ের মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। বিষয়টি বছর জুড়েই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ।
গত বছরে এমন কোনো নিত্যপণ্য খুঁজেই পাওয়া কঠিন ছিল যে, যার দাম বাড়েনি। তবে যেসব পণ্য একেবারে মৌলিক প্রয়োজন মেটায় (যেমন- চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল ইত্যাদি) সেসব কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল মাছ, মাংস ও ডিমের মতো আমিষের খাদ্যদ্রব্যে। বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে বাজার ছিল অস্থির।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার যেমন দাম কমাতে পারেনি, তেমনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তাদের চার মাসের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বাজার। ফলে বছরজুড়ে দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট হয়েছিল গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হঠাৎ করে চাল, আলু, আটা, ডিম, মুরগি ও গরুর মাংসের দাম বাড়তে শুরু করে। এরপর ভারত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করলে হঠাৎ করে তা সেঞ্চুরি হয়ে যায়। ডিম-আলুও দেখায় তেলেসমাতি।
গত বছর সবচেয়ে আলোচিত ছিল ডিম। গত অক্টোবরে ফার্মের ডিমের ডজন ১৮০ টাকায় ওঠে। ব্যবসায়ীরা বন্যাকে দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছিলেন। তাদের মতে, বন্যায় খামারের ব্যাপক ক্ষতি এবং মুরগি মারা যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন। বন্যায় লাখ লাখ মুরগি মারা গিয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন তারা। এ কারণে ডিমের বাজার চড়া হয়ে ওঠে ছিল।
বাজারের লাগাম টানতে এক পর্যায়ে ডিমের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে দিয়ে ছিল সরকার। পাশাপাশি ডিম আমদানির অনুমতি ও শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছিল। ভারত থেকে কয়েক দফায় কিছু ডিম আমদানির পর স্বাভাবিক হয়েছিল বাজার।
আলুও কম আলোচনার জন্ম দেয়নি। বছরের বেশির ভাগ সময় আলুর কেজি ৫০ টাকার ওপরে ছিল। এমনকি নভেম্বর মাসে এটি ৮০ টাকায় পৌঁছায়। ডিমের মতো আলুও ভারত থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে নতুন আলুর বাজারে প্রবেশের ফলে দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
ডিম, আলুর পাশাপাশি বছর জুড়েই দেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে চলছে অস্থিরতা। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও দোকানি বলে দিচ্ছেন- তেল নেই। আবার কোথাও তেল পেতে গেলে সঙ্গে কিনতে হয়েছে অন্য পণ্যও। আবার অতিরিক্ত দামেও এই ভোজ্যতেল বিক্রির অভিযোগ ছিলো সারা বছর।
বছরের শেষদিকে শুল্ক ছাড়ের পরও বিশ্ববাজারে দর বাড়ার অজুহাতে দাম বাড়ান আমদানিকারকরা। দাম বাড়ানোর আগে কয়েকদিনের জন্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় বোতলজাত সয়াবিন তেল। বাড়তি দরে বিক্রি হয় খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েল। সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে দাম বাড়ানোর ঘোষণার দিনই বাজার ভরে গেছে লুকানো তেলে।
বছরের প্রথমেই মুরগির মাংসের দামও বেড়ে যায়। ব্রয়লারের কেজি ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০-৩২০ টাকায় ঠেকে।
গত বছর রেকর্ড গড়েছিল সবজির বাজার। বছর জুড়েই এমন কোনো সবজি নেই, যার দাম বাড়েনি। স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ দাম বাড়তি ছিল সবজির। বিশেষ করে জুলাইয়ের শেষদিকে বেশির ভাগ সবজির দাম শতক পেরিয়ে যায়। যেমন– প্রতি কেজি করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, বরবটি ও কচুরমুখী ১০০ থেকে ১১০, বেগুন ১৪০ থেকে ১৫০, কাঁকরোল ৯০ থেকে ১০০, গাজর ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ও মুলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। এভাবে প্রায় সব সবজির দাম এক প্রকার আকাশ ছুঁয়েছিল।
তবে বছরের শেষ দিকে বাজারে বেড়েছিল শীতকালীন সবজির সরবরাহ। কিন্তু পাইকারি দাম কমলেও কম ছিল না খুচরা বাজারে। পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরায় সবজি কিনতে গুণতে হচ্ছিল অতিরিক্ত মূল্য। হাত বদলেই সবজির দাম বেড়েছিল ৫ থেকে ৮ গুণ।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছিল, ১২ মার্চ রমজান শুরুর আগেই খেজুরের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বস্তায় ভরা ১৪০ টাকা জাহিদি খেজুর ৩০০ টাকা ও মরিয়ম খেজুরের কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়ে যায়। ভোক্তাদের ৯০ টাকা কেজির ছোলা ১১০ টাকায়, শসা ১৪০, পেঁয়াজ ১৩০ টাকায় কিনতে হয়। শুধু তা-ই নয়, রমজান মাসে চালের ব্যবহার কম হলেও দাম বেড়ে যায়।
বছরের শুরু থেকেই অস্থির চালের বাজার। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দাম বাড়তে পারে, এবং যা জুনে কিছুটা কমবে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক করতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ পদক্ষেপ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার, গত সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মাসে। যেমন গত অক্টোবরে চাল আমদানিতে বিদ্যমান তিন ধরনের শুল্ক কমানো হয়। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ ও বিদ্যমান আগাম কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়।
এভাবে সেপ্টেম্বরে আলু আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ ও বিদ্যমান ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। অক্টোবরে ডিম আমদানিতে শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি অপরিশোধিত ও পরিশোধিত চিনির ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
ভোজ্যতেল আমদানিতেও বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। আর নভেম্বরে পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক-কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।