১৫ বছর ধরে অতিথি পাখির আশ্রয় নাজিরপাড়া, গ্রামজুড়ে এখন কিচিরমিচির

মোঃ মাহমুদুল হাসান বাবু, পঞ্চগড় প্রতিনিধি:

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পৌর এলাকার নাজিরপাড়া গ্রামে সকাল শুরু হয় শত শত পাখির কিচিরমিচির শব্দে। গাছের ডালে ডালে বাসা, বাসায় মাথা উঁচু করে বসে থাকা ছানা, আর খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত মা পাখিদের উড়াউড়িতে যেন মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। প্রায় দেড় দশক ধরে প্রতি বছর বংশবিস্তারের জন্য নানা প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি এ গ্রামকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের বড় বড় গাছজুড়ে অসংখ্য বাসা। শামুকখোল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচরা, ঘুঘুসহ নানা পাখির অবাধ বিচরণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কিচিরমিচির আর ডানা ঝাপটানোর শব্দে প্রাণ ফিরে পায় পুরো এলাকা। প্রতিটি গাছেই চোখে পড়ে অসংখ্য বাসা। কোথাও সদ্য ফোটা ছানারা মাথা উঁচু করে বসে আছে, কোথাও মা পাখি ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী, দর্শনার্থী ও আলোকচিত্রীদের ভিড় জমে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে এসব পাখি নাজিরপাড়ায় আসে। গাছের ডালে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে, ছানা ফোটায় এবং প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অবস্থান করে। এরপর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বংশবিস্তার শেষ হলে আবার নিজ নিজ আবাসস্থলে ফিরে যায়। এভাবেই প্রায় ১৫ বছর ধরে চলছে তাদের আসা-যাওয়া।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান আজাদ বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রতিবছরই এসব পাখি এখানে আসে। বিদেশি পাখির মধ্যে শামুকখোল সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি ও রাতচরা পাখিও রয়েছে। বাইরে থেকে অনেকেই পাখি শিকার করতে এলেও গ্রামের তরুণ ও অভিভাবকেরা মিলে তা প্রতিহত করেন। নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ায় পাখিগুলো প্রতি বছর এখানেই ফিরে আসে।

তিনি বলেন, সকালে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে। তবে পাখির মলমূত্রে রাস্তা ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয়, দুর্গন্ধও ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হলে আমাদের ভোগান্তি কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দা তমিজদার রহমান খোকা বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে শামুকখোল, পানকৌড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির বক আসছে। এসব পাখি দেখতে সাংবাদিক, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন। গ্রামের মানুষ কোনোভাবেই পাখি শিকার করতে দেন না।

হাবিবুল আলম বলেন, এই পাখির কারণেই নাজিরপাড়া আজ পরিচিতি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। পাখির মলমূত্রের কারণে কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ তা মেনে নিয়েছেন। তবে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রামের মানুষ নিয়মিত পাখিদের খাবারও দেন।
স্থানীয় শিক্ষার্থী মানহা বলে, প্রতি বছর বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ শুধু এসব পাখি দেখতে আসে। বিকেলে পাখিদের উড়াউড়ি আর কলকাকলি পুরো পরিবেশকে আনন্দময় করে তোলে।

পাখি দেখতে আসা ফারুক ইসলাম বলেন, বিকেলের সময় নাজিরপাড়ার পরিবেশ সত্যিই দারুণ লাগে। শত শত পাখির কিচিরমিচির আর গাছজুড়ে তাদের বিচরণ যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, বোদা পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি এখানে এসে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে। বিশেষ করে বকজাতীয় বড় পাখিগুলো নিশ্চিন্তে এখানে অবস্থান করে।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং পাখি সংরক্ষণে সচেতন করা হয়েছে। স্থানীয়রাও পাখিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক। কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে তারা বাইরের দর্শনার্থী ও পর্যটকদেরও সচেতন করেন।
ইউএনও আরও বলেন, যেসব গাছে পাখিগুলো বাসা বাঁধে, সেসব গাছ সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে। গাছ না কাটার জন্য বাসিন্দাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে।