অজ্ঞান পার্টির শিকার ডাক্তার শরীফ; পাশে দাঁড়ালেন মানবিক পুলিশ হাসান

 

আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):

 

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস, ট্রেন ও জনবহুল এলাকায় “মলম পার্টি” নামে পরিচিত প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতারকরা যাত্রী বা সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে বিভিন্ন ধরণের বিষাক্ত মলম, তেল বা চেতনানাশক রাসায়নিক দ্রব্য লাগিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। এ অবস্থায় ভুক্তভোগী দীর্ঘ সময় জ্ঞাণ হারিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকছে। কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারাও যাচ্ছে। এই চক্রের অভিনব কৌশলে সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিরাও রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৬ জুন (মঙ্গলবার) এমনই এক নির্মম ঘটনার শিকার হয়েছেন শরীফ আহম্মদ (৬১) নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার।

 

জানা যায়, ডাক্তার শরীফ আহম্মদ চলতি বছর জানুয়ারি মাসে সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহন করলেও অসুস্থ মানুষদের সেবা দেবার লক্ষ্যে তিনি নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে তোলেন “আড়াইহাজার ডায়াবেটিস হাসপাতাল” নামে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। ঘটনার দিন ডাক্তার শরীফ ৫২/২ তোপখানা রোডস্থ বিএমএ. (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) ভবন থেকে নিজ হাসপাতালের জন্য বেশ কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় করার উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে পুরানা পল্টন যাওয়ার জন্য মেঘলা পরিবহন নামের একটি বাসে উঠে জানালার পার্শ্বে সিট নিয়ে বসেন। বাসের কন্ট্রাকটরকে ভাড়া পরিশোধের সময় তিনি পল্টন নামবেন বলে জানিয়েও রাখেন। এর কিছুক্ষণ পর তার পাশের খালি আসনটিতে অন্য এক যাত্রী এসে বসেন। কয়েকটি স্টপেজ পার হয়ে বাসটি যাত্রাবাড়ি পৌঁছলে এক “আচার” বিক্রেতা (ফেরিওয়ালা) বাসে উঠে ডাক্তার শরীফের কাছে আচার বিক্রি করতে চাইলে, তিনি তা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এসময় আচার বিক্রেতা ডাক্তার শরীফের কোলের উপর পলিথিনে মোড়ানো আচারের একটি পোটলা ফেলে রেখে বলে যে, “স্যার, ভালো আচার, খাইয়া দ্যাহেন, ভালো না লাগলে টাকা দিয়েন না” এই বলে আচারওয়ালা দ্রুত বাসের ভিতরের দিকে চলে যায়। ডাক্তার শরীফ যাত্রা পথে এ ধরনের খাবার গ্রহনে অনভ্যস্ত হওয়ায় এবং আচারওয়ালা দ্রুত তার সামনে থেকে চলে যাওয়ায় নিরুৎসাহিত হয়ে আচারের পোটলাটি তিনি ওভাবেই রেখে দেন।

 

মেঘলা পরিবহনের বাসটি পল্টনের কাছাকাছি আসতেই ডাক্তার শরীফের পাশের সিটে যে যাত্রী বসে ছিল, হঠাৎই সে দাঁড়িয়ে শরীফের গা ঘেঁষে তার উপর দিয়ে জানালার বাইরে থুতু ফেলার ভঙ্গি করে এবং মুহূর্তের মধ্যে ডাক্তার শরীফের মুখমন্ডলে দুই হাত ঘষে দেয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ডাক্তার শরীফ কিছু বলতে গিয়ে বিরবির করে “এই আপনি কী ক.. . “ পুরো বাক্য শেষ করার আগেই নেতিয়ে পড়েন। অতঃপর যা ঘটার ঘটে যায়।

 

বাসটি পল্টন ও প্রেসক্লাবের বিপরীত পার্শ্বের বিএমএ. ভবন পার হয়ে শাহবাগ এসে পৌঁছলে অচেতন অবস্থায় গাড়ির সিটে নেতিয়ে পড়া ডাক্তার শরীফ বাসের স্টাফদের নজরে আসেন। এ অবস্থায় বাসের কন্ট্রাক্টর ও হেলপার ধরাধরি করে ডাক্তার শরীফকে বাস থেকে নামিয়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখান থেকে শাহবাগ থানায় খবর গেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শাহবাগ থানার এসআই. হাসানুজ্জামান হাসান। এসময় গুরুতর অসুস্থ ও চেতনাবিহীন ডাক্তার শরীফকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এসআই. হাসান। ঘড়ির কাটায় সময় তখন সন্ধ্য ৬ টা ১৫ মিনিট। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে ভিকটিমের নাম-পরিচয় অনুসন্ধানের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করেন এসআই. হাসান।

 

এদিকে ডাক্তার শরীফের স্ত্রী আড়াইহাজারের বাড়িতে স্বামী ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে গুণতে এক সময় ধর্যহারা হয়ে স্বামীর মোবাইলে বারবার ফোন দিয়ে তা বন্ধ পান। অস্থীর হয়ে নিকট আত্মীয়-স্বজনদের বিষয়টি জানান তিনি। অতঃপর পরদিন দুপুর পর্যন্ত সবাই মিলে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ-খবর করে ডাক্তার শরীফের কোনো সন্ধান মেলেনি। শেষে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর তখনই অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনদাতা অপরপ্রান্ত থেকে নিজের পরিচয়ে বলেন, তিনি শাহবাগ থানার এসআই. হাসানুজ্জামান। ডাক্তার শরীফ অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি রয়েছেন বলে জানান তিনি। সকলে ছুটে যান ঢামেকে। খুঁজে পান ডাক্তার শরীফকে, স্যালাইন লাগানো ও সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায়। কর্তব্যরত ডাক্তার জানান, রোগীর অবস্থা গুরুতর, আইসিইউ প্রয়োজন, কিন্তু আইসিইউতে বেড খালি নেই। এ অবস্থায় স্বজনরা ডাক্তার শরীফকে সেখান থেকে হলিফ্যামিলী হাসপাতালে নিয়ে যান। টানা ৩ দিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসার পর জ্ঞাণ ফিরে ডাক্তার শরীফের। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সময় লাগে ২ সপ্তাহের উপর। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুলে বলেন তিনি স্বজনদের কাছে।

 

এসআই. হাসানের হাতে কিছুই ছিল না ডাক্তার শরীফের পরিচয় খুঁজে পাবার জন্য। প্রতারকরা ডাক্তার শরীফের প্যান্ট ও শার্টের সব ক’টি পকেট হাতিয়েছে। প্যান্টের পেছনের পকেটে থাকা মানিব্যাগ, এক পার্শ্বের পকেটে পণ্য কেনার জন্য আলাদা করে রাখা ৫০ হাজার টাকা ও অন্য পকেট থেকে মোবাইল ফোন, সব নিয়ে গেছে প্রতারক চক্র। এর মাঝে এক পকেটে রয়ে যায় শুধুমাত্র সোনালী ব্যাংকের একটি এটিএম. কার্ড। এই কার্ডের সূত্র ধরেই এসআই. হাসান পরদিন চলে যান সোনালী ব্যাংকের হেড অফিস মতিঝিলে। সেখান থেকে বের করে আনেন ভিকটিম ডাক্তার শরীফের স্থায়ী ঠিকানা, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার। হাসান সাথে সাথে ওয়্যারলেস বার্তা পাঠান আড়াইহাজার থানা পুলিশের কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেড়িয়ে আসে ডাক্তার শরীফের পূর্ণ পরিচয়। পাওয়া যায় স্বজনদের কিছু মোবাইল নম্বরও। এভাবেই বড় ধরণের ক্ষতি হতে রক্ষা পান ডাক্তার শরীফ ও তার পরিবার। এ বিষয়ে পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের ধারাবাহিক সুনিপুন পদক্ষেপের জন্য ডাক্তার শরীফ, তার আত্মীয়-স্বজন ও আড়াইহাজার ডায়াবেটিস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে এসআই. হাসানুজ্জামান ও শাহবাগ থানা পুলিশের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

 

এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ ধরণের সমস্যা মোকাবেলায় মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াছিন জাহান নিশান বলেন, “সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবন স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি জোরদার করা যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি একইসাথে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অতীব জরুরী।” অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া কোনো খাবার, পানীয়, ওষুধ বা মলম গ্রহন না করা এবং সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তিকে দেখলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। সচেতনতা, সতর্কতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এসব মলম পার্টির দৌরাত্ম্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন এই মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী ইয়াছিন জাহান নিশান।