প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
সময়: ০৯:২৭ পিএম
কুলিয়ারচরে বিদ্যালয় কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব: অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সরে দাঁড়ালেন প্রস্তাবিত সভাপতি
মোঃ মাইন উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের দড়িগাঁও ৪৩নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, তদন্ত চলাকালে দুই পক্ষের উত্তেজনা, মানববন্ধনকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা এবং শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণে অনাগ্রহ- সব মিলিয়ে বিদ্যালয়টির সার্বিক পরিবেশ প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিভিন্ন সুত্র ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী সাবেক সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান মোস্তাক, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তার ও নবগঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ঘিরে কয়েক মাস ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধের জেরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্তও হয়েছে, তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। তবে তদন্ত চলাকালে পরিস্থিতি কতটা উত্তপ্ত ছিল, তারও প্রমাণ মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানববন্ধন ঘিরে উত্তেজনা:
গত ৩১ জুলাই সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, অপপ্রচার ও শিক্ষকদের অপমানের প্রতিবাদে এবং বৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটি বানচালের অভিযোগে সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান মোস্তাক ও স্থানীয় কামাল হোসেনের বিচার দাবিতে এলাকাবাসীর ব্যানারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছিল। মানববন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ রোমান খান। তবে সেদিন কর্মসূচি শুরুর আগেই আয়োজকদের পাশাপাশি সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান মোস্তাকের সমর্থকেরা বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ হস্তক্ষেপ করেন। পরে প্রশাসনের পরামর্শে মানববন্ধন স্থগিত করা হয়।
ঘটনার পর আয়োজকেরা বিদ্যালয় এলাকা ত্যাগ করলেও মাঠে অবস্থানকারী একদল ব্যক্তি রোমান খানকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন স্লোগান দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় রোমান খান বাদী হয়ে কুলিয়ারচর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
রোমান খান বলেন, আমি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। প্রশাসনের পরামর্শে সংঘাত এড়াতে মানববন্ধন স্থগিত করেছিলাম। সেদিন পরিকল্পিতভাবে কর্মসূচি বানচাল এবং সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা:
বিতর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নবগঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রস্তাবিত সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মোঃ আনোয়ার হোসেন দায়িত্ব গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তিনি এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আমার কারণে কোনোরকমের বিশৃঙ্খলা হোক, তা আমি চাই না। এলাকাবাসী যদি সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে দায়িত্ব দেয়, তখন বিষয়টি বিবেচনা করব।
তাঁর এই অবস্থান বিদ্যালয়ের চলমান সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পাল্টা বক্তব্য:
মানববন্ধনে বাধা দেওয়া কিংবা উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান মোস্তাক। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক অভিযোগ করেছেন, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। তাঁর দাবি, মানববন্ধনে বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েই এলাকাবাসীর ক্ষোভ রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য মেলেনি:
বক্তব্য জানতে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
শিক্ষা বিভাগের অবস্থান:
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এ টি ও) আনিসুল হক বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ এবং একাধিক লিখিত অভিযোগের পর তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসেনি। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্নের মুখে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশ:
একটি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, তদন্ত, মানববন্ধন, পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং প্রস্তাবিত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা- এসব ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দড়িগাঁও ৪৩নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সংকট এখনো কাটেনি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা বিভাগ কি সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর মাধ্যমে চলমান অচলাবস্থার অবসান ঘটে কি না, সেদিকেই এখন নজর অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের।