ভৈরব থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া: পথের মাঝে দুই যুবকের এক সত্যের গল্প

Date: 2026-06-20
news-banner

মোঃ মাইন উদ্দিন :

ভ্রমণ শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছানোর নাম নয়, ভ্রমণ মানে কখনো কখনো কিছু অচেনা মুখের সঙ্গে ক্ষণিকের পরিচয়, কিছু অজানা গল্পের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ ও চলার পথে জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

সেদিন আমার গন্তব্য ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ভৈরব থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসটি আপন গতিতে ছুটে চলছিল। জানালার পাশে বসে আমি মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম বিশাল মেঘনার বিস্তীর্ণ জলরাশি আর তার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিপল সেতুর অবয়ব। নদী পার হলেই আশুগঞ্জ। আশুগঞ্জ- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রবেশদ্বার। এরপর বাস এগিয়ে চলে সবুজে মোড়া জনপদের বুক চিরে। দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা গাছপালা, নিভৃত গ্রামের ঘরবাড়ি আর বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি যেন চলমান এক ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
প্রকৃতির সেই নির্মল সৌন্দর্যের মধ্যে হঠাৎই কানে এসে পৌঁছালো সামনের সিটে বসা দুই যুবকের কথোপকথন। তাদের কথাগুলো ছিল ক্ষোভের, অভিজ্ঞতার, আবার এক ধরনের রাজনৈতিক উপলব্ধিরও।

তারা বলছিল, যদি কখনও সুযোগ হয় তখন এদের হিসাবই আগে নেবো। ওদের কথা হলো, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, তারা আদর্শের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। বিগত দিনে যারা প্রভাবশালীদের ছত্র-ছায়ায় মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ করেছে, নানা সুবিধা নিয়েছে, আজ আবার তারাই অন্য পরিচয়ে একই কাজ করে যাচ্ছে। অথচ যারা বিশ্বাস, আবেগ আর আদর্শ নিয়ে রাজনীতির পথে হেঁটেছে, তাদের কাঁধেই অনেক সময় নেমে আসে ত্যাগ, কষ্ট, মামলা, হামলা, নির্যাতন কিংবা অবহেলার বোঝা।

আমি নীরবে তাদের কথা শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল, চলন্ত বাসের একটি সাধারণ সিট যেন মুহূর্তের জন্য মাদকসহ নানা অপরাধ তথা সমাজ ও রাজনীতির এক ক্ষুদ্র আলোচনার মঞ্চে পরিণত হলো।

আসলে জীবন বড় অদ্ভুত শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, বইয়ের পাতা কিংবা বড় বড় সভা-সেমিনারের বাইরেও মানুষ শিক্ষা পায়। মাঝে মধ্যে সেই শিক্ষা এসে ধরা দেয় পথের ধুলায়, কোনো অপরিচিত সহযাত্রীর কথায়, কিংবা কয়েক মিনিটের একটি সাধারণ আলাপচারিতায়।

আমাদের সমাজের একটি বড় সংকট হলো- আমরা প্রায়ই দল, ব্যক্তি কিংবা স্বার্থের রঙিন চশমা পরে মানুষকে বিচার করি। সেই চশমার রঙ যত রঙিন হয়, সত্য তত ঝাপসা হয়ে যায়। আসলে ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ হিসেবে দেখার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ বিবেকের আয়না।

এভাবেই কথা বলতে বলতে একসময় বাস তার গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দুই যুবক নেমে পড়ে তাদের নিজ পথে। নাম-ঠিকানা জানা হয়নি। হয়তো জীবনের দীর্ঘ পথে তাদের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না, কিন্তু মেঘনা পাড়ি দেওয়া সেই দিনের যাত্রায় তারা আমার মনে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

অল্প সময় তাদের আলোচনা শুনে আমি উপলব্ধি করেছি- দেশের তরুণ সমাজের ভেতর এখনো প্রশ্ন করার শক্তি আছে, অন্যায়কে বোঝার ক্ষমতা আছে, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে।

সেদিন থেকে ওই দুই অচেনা যুবকের জন্য আমার অন্তরের গভীর থেকে প্রার্থনা করি- জীবনের পথে তারা যেন সততা, মানবিকতা ও বিবেকের আলোকে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। আল্লাহ তাদের সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন দান করুন।

Leave Your Comments