রবার্ট এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড: যে রাতে বদলে গিয়েছিল আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস

Date: 2026-06-05
news-banner

১৯৬৮ সালের ৫ জুন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের অ্যাম্বাসেডর হোটেলে বিজয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রবার্ট এফ কেনেডি। ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয় পাওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ শেষ করে তিনি যখন সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশে রান্নাঘরের করিডর দিয়ে এগোচ্ছিলেন, তখনই আততায়ীর গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন।

পরদিন ৬ জুন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২ বছর।

রবার্ট ফ্রান্সিস কেনেডি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট John F. Kennedy–এর ছোট ভাই। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর পর একইভাবে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন রবার্ট কেনেডি। এই দুই হত্যাকাণ্ড কেনেডি পরিবারকে যেমন শোকাহত করেছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

১৯২৫ সালের ২০ নভেম্বর ম্যাসাচুসেটসের Brookline শহরে জন্মগ্রহণ করেন রবার্ট কেনেডি। তিনি প্রভাবশালী কেনেডি পরিবারের সদস্য ছিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

ভাই জন এফ কেনেডি ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে রবার্ট অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, সংগঠিত অপরাধ দমন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলে।

১৯৬৮ সাল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অস্থির সময়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের উত্তাপে দেশ তখন উত্তাল। একই বছরের ৪ এপ্রিল নিহত হন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা Martin Luther King Jr.। এমন পরিস্থিতিতে রবার্ট কেনেডি অনেক আমেরিকানের কাছে পরিবর্তন ও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

৪ জুন ক্যালিফোর্নিয়া প্রাইমারিতে জয় লাভের পর মধ্যরাত পেরিয়ে অ্যাম্বাসেডর হোটেলে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। ভাষণ শেষে রান্নাঘরের করিডর দিয়ে যাওয়ার সময় ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সিরহান সিরহান তাঁর ওপর গুলি চালান। গুলিতে রবার্ট কেনেডি গুরুতর আহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরদিন চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

গ্রেপ্তারের পর সিরহান সিরহান দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রতি রবার্ট কেনেডির সমর্থনের কারণেই তিনি এই হামলা চালিয়েছেন। পরে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রবার্ট কেনেডি জীবিত থাকলে ১৯৬৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। তাঁর মৃত্যু ডেমোক্রেটিক পার্টিকে বড় ধাক্কা দেয় এবং পরবর্তীতে রিপাবলিকান প্রার্থী Richard Nixon নির্বাচনে জয়ী হন।

বর্তমানে রবার্ট এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের Arlington National Cemetery-তে তাঁর ভাই জন এফ কেনেডির সমাধির পাশে শায়িত আছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক ভবিষ্যতেরও অবসান।

Leave Your Comments