স্বপ্ন ছিল আকাশ জয় করার, দায়িত্ব ছিল দেশ মাতৃকার সুরক্ষায় আকাশে উড়বার। সেই স্বপ্ন আর দায়িত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর। কিন্তু জ্বলজ্বল করতে না করতেই নিভে গেলো তারাটি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলাকালে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন দেশের এই প্রতিশ্রুতিশীল পাইলট। রেখে গেলেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা, গর্ব এবং শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে এমন বিদায় যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, এমনকি পুরো জাতি। কিন্তু তার কর্মময় জীবন, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। তার শিক্ষাজীবন, সামরিক প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল সাফল্যে ভরপুর- যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসের কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটি এ কে খন্দকার প্যারেড গ্রাউন্ডে তৌকিরের জানাজার আগে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন।
এক প্রতিশ্রুতিশীল, মেধাবী এবং নিবেদিতপ্রাণ বৈমানিক ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগর। স্বপ্ন ছিল দেশের আকাশকে রক্ষা করার, দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গর্ব হয়ে ওঠার। সেই দায়িত্ব পালনে সোমবার (২১ জুলাই) শেষ প্রশিক্ষণে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তৌকির।
তৌকির ইসলাম সাগর ১৯৯৭ সালের ৯ নভেম্বর রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া থানার সপুরা ছয়ঘাটি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ তহুরুল ইসলাম একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সদস্য। মাতা মোছাম্মত সালেহা খাতুন একজন গৃহিণী।
তিনি ২০১৪ সালে পাবনা ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
তৌকির ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি জেনারেল ডিউটি পাইলট (জিডিপি) শাখায় কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি ১৫ নম্বর স্কোয়াড্রনের পাইলট, ৩৫ নম্বর স্কোয়াড্রনের স্কোয়াড্রন পাইলট এবং অ্যাডজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মাত্র ৫ বছর ৭ মাস ২১ দিনের চাকরি জীবনে তৌকির উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। তার প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল- বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১১ স্কোয়াড্রন থেকে বেসিক ফ্লাইং ট্রেনিং, ১৫ স্কোয়াড্রন থেকে বেসিক জেট ফাইটার কনভারশন কোর্স, অ্যারোনটিকেল ইনস্টিটিউট থেকে ফিজিওলজিক্যাল ট্রেনিং ও ফিজিওলজিক্যাল ইনডক্রিনেশন কোর্স, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স থেকে অফিসার্স বেসিক এয়ার ইন্টেলিজেন্স কোর্স, বগুড়া রাডার ইউনিট থেকে ইলেকট্রনিক এয়ার ওয়ারফেয়ার কোর্স, স্কুল অব ফিজিক্যাল ফিটনেস থেকে ওয়াটারম্যানশিপ, বিমান বাহিনী একাডেমি থেকে পটেনশিয়াল ফ্লাইট কমান্ডার কোর্স, সর্বশেষ ভারত থেকে 'অপারেশন ইন ট্রেনিং এরোস্পেস মেডিসিন ফাইটার' কোর্স সম্পন্ন করেন তিনি, এই তরুণ পাইলট সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে বিমান বাহিনীতে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব এবং মানবিক গুণাবলির জন্য সহকর্মী ও সিনিয়রদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
সোমবার (২১ জুলাই) দুপুর আনুমানিক ১টা ১৩ মিনিটে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ঢাকায় নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২৭ বছর ৮ মাস ১৩ দিন।
২২ জুলাই রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এক আবেগঘন পরিবেশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় রাজশাহীর সপুরা গোরস্থানে।