বার্তা বিচিত্রা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | পর্ব–০২
রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কর্মরত উমেদার বাবু হাওলাদারের নাম শুনলে আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র দলিল লেখকও। কারণ, এই এক ব্যক্তির হাতে গড়ে উঠেছে এমন এক ‘অদৃশ্য দপ্তর’—যেখানে আইনের চেয়ে বেশি কার্যকর হয় তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, রাগ, ক্ষোভ ও ঘুষের টাকার অঙ্ক।
প্রশ্ন জাগে, “কীভাবে একজন উমেদার এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলো?”
আরও বড় প্রশ্ন—“একজন ঘুষখোর, খুনের মামলায় স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামি কীভাবে বছরের পর বছর ধরে সরকারি অফিসে বহাল থাকেন?”
বাবু হাওলাদারের চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল মাত্র ১২০ টাকার দৈনিক হাজিরায়, অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে। অথচ আজ তাঁর নামে-বেনামে রয়েছে বহুসংখ্যক জমি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স এবং ব্যবসা। শুধু তিনিই নন, তাঁর স্ত্রী, ভাই-বোন ও আত্মীয়দের নামেও গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।
এই সমস্ত সম্পদের কাগজপত্র এখন বার্তা বিচিত্রার হাতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ সরকারিভাবে তিনি যে বেতন পান, তা দিয়ে নিজের মাসিক খরচই চালানো অসম্ভব!
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে, যেন 'দলিল' মানেই 'ঘুষ'।
একাধিক দলিল লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী—
> “দলিল পাশ করাতে হলে নির্ধারিত টাকাটা বাবুর লোকদের হাতে তুলে দিতেই হবে। তা না হলে দলিলের ফাইল দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস আটকে থাকবে।”
বাবুর ‘ঘনিষ্ঠ’ কয়েকজন দলিল লেখক কার্যত তার হয়ে ঘুষ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। ঘুষের টাকা নির্ধারিত হারে ভাগ হয়—একটি অংশ যায় রেজিস্ট্রি অফিসের আরও কিছু অসাধু কর্মচারীর পকেটে, আর বেশিরভাগ অংশ জমা পড়ে বাবুর হাতে।
প্রতি মাসে এই অফিস থেকে বাবুর ঘুষ আয় ৮-১০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়—এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন একাধিক সূত্র।
গোপনে ধারণ করা একাধিক অডিও রেকর্ডিং বার্তা বিচিত্রার হাতে এসেছে, যেখানে বাবুকে বলতে শোনা যায়:
> “ঘুষ ছাড়া এখানে কিছু হয় না। কার দলিল কবে হবে, সেটা আমি ঠিক করি।”
“মন্ত্রীর লোক হলেও খরচ না দিলে দলিল হবে না!”
এমন স্পষ্ট ভাষায় দুর্নীতির ঘোষণাই প্রমাণ করে, বাবু নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন। এই দম্ভ ও দুঃসাহসের পেছনে প্রশাসনের কোনো মহলের ছত্রছায়া রয়েছে—এমন সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, বাবু হাওলাদার একজন আলোচিত হত্যা মামলার আসামি।
এক ব্যক্তি খায়রুল হত্যার ঘটনায় তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেন। অভিযোগ ছিল, বাবুর মারধরের কারণেই মৃত্যু হয় খায়রুলের। তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন কারাগারে। জামিনে মুক্তি পেলেও কোনো তদন্ত, বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন ওঠে—আইনের চোখে কি সবাই সমান?
একজন খুনের মামলায় জবানবন্দি দেওয়া ব্যক্তি যদি আবারো অফিসে ঘুষ নিয়ে সক্রিয় থাকে, তাহলে সাধারণ জনগণের কী নিরাপত্তা থাকবে?
প্রথম পর্ব ছাপার পর দিনই ঘটে আরেকটি ভয়ঙ্কর ঘটনা।
মোহাম্মদপুরে বার্তা বিচিত্রা বিক্রি করছিলেন হকার সুজন। হঠাৎ ৮-১০ জন যুবক এসে তার কাছ থেকে পত্রিকাগুলো ছিনিয়ে নেয় এবং বলে:
এই পত্রিকা যদি আর একবার দেখি, সুজন তোর খবর আছে!”
সাংবাদিকতা মানেই যদি হুমকি ও নির্যাতন হয়, তবে প্রশ্ন উঠে—সত্য প্রকাশের জায়গাটা কোথায়?
বাবুর সকল সম্পদের তদন্ত হোক এবং তা সরকারিভাবে বাজেয়াপ্ত করা হোক।
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘুষ সিন্ডিকেট চিহ্নিত করা হোক।
হকার ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কীভাবে এত বছর ধরে তাকে আড়াল করলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হোক।
প্রতিবেদকের বক্তব্য: এই প্রতিবেদনের সকল তথ্য বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানী টিম প্রমাণসহ সংগ্রহ করেছে। সম্পত্তির দলিল, অডিও রেকর্ডিং, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য প্রামাণ্য দলিল আমাদের সংগ্রহে রয়েছে। আইনি প্রয়োজনে তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।