উমেদার বাবুর অঘোষিত সাম্রাজ্যের ভিতরকার ভয়াবহতা

Date: 2025-05-12
news-banner

 উমেদার বাবুর অঘোষিত সাম্রাজ্যের ভিতরকার ভয়াবহতা

বার্তা বিচিত্রা অনুসন্ধান প্রতিবেদন | পর্ব-০১

একজন সাধারণ বাদাম বিক্রেতা। তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দিনভর বাদাম বিক্রি করতেন। আর আজ? তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু—উমেদার বাবু হাওলাদার। ক্ষমতা, ঘুষ, প্রভাব, ভয়ভীতি—সবকিছু মিলিয়ে তার যেন একক রাজত্ব। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাও কঠিন—কীভাবে একজন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী এমন জায়গায় পৌঁছতে পারেন, যেখানে আইনের শাসনের কোনো ছায়াও পড়ে না!

ক্ষমতার নেপথ্য ইতিহাস

বাবু হাওলাদারের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ১২০ টাকা হাজিরা বেতনে। প্রথমে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঢুকেছিলেন। কেউ চিনত না, জানত না। ধীরে ধীরে চতুরতা, হিংস্রতা, আর ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি দখলে নিতে থাকেন দলিল লেখকদের, রেজিস্ট্রার অফিসের স্টাফদের, এমনকি স্থানীয় দালালদের মন-মানসিকতা। এক সময় দেখা গেল—যে ফাইল বাবু ছাড়ে না, তা রেজিস্টার হয় না।

ঘুষের রাজনীতি: ওপেন সিক্রেট

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে ‘টাকা’ লাগবেই—এটা এখন ওপেন সিক্রেট। বাবু হাওলাদার তার ঘনিষ্ঠ কিছু দলিল লেখকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন পুরো অফিস। ঘুষের অংক নির্ধারিত, তার ভাগও নির্ধারিত। কেউ নিয়ম ভাঙলে ফাইল আটকে যায়, দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হন সাধারণ মানুষ। অথচ এই প্রক্রিয়াকে অফিসের অনেকেই "রুটিন ওয়ার্ক" বলেই মেনে নিয়েছেন।

একটি হত্যা মামলা, একটি স্বীকারোক্তি, তবুও অক্ষত অবস্থান!

বাবু হাওলাদারের বিরুদ্ধে রয়েছে সরাসরি একটি আলোচিত হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি স্বীকার করেছিলেন, তার মারধরের কারণেই প্রাণ হারান খায়ুরুল নামের একজন নিরীহ মানুষ। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। জামিনে মুক্ত হলেও, বিস্ময়ের বিষয় হলো—এই ভয়ঙ্কর অপরাধের পরেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা। বরং অভিযোগ আছে—দুর্দান্ত আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের অপরাধের ফাইল আজও “আলো দেখায়নি” বাবু।

অঢেল সম্পত্তির পাহাড়

একজন উমেদার, যাঁর মাসিক আয় নামমাত্র—তার নামে রাজধানীর গুলশান, গাজীপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে জমি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শুধু নিজের নামে নয়—স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, এমনকি পরিচিতজনদের নামেও কিনেছেন অসংখ্য জমি। বার্তা বিচিত্রার হাতে এসেছে তার নামে ও বেনামে একাধিক জমির খতিয়ান ও দলিল—যা প্রশ্ন তোলে, সরকারি চাকরি করেই কীভাবে এমন সম্পদ অর্জন সম্ভব?

কারা তাকে রক্ষা করে?

প্রশ্ন হচ্ছে—এত কিছু সত্ত্বেও কেন তার বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয় না? প্রশাসনের কে বা কারা তাকে আড়াল করে রাখে? কোথায় দুর্নীতি দমন কমিশন? কোথায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরদারি? বাবু হাওলাদারের মত একজন ব্যক্তি যদি আদালতে খুনের কথা স্বীকার করে জেল খেটে এসে আবার ঘুষ বাণিজ্য করতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে?

এই প্রতিবেদন কোনো এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়

এই প্রতিবেদন বাবু হাওলাদার নামক একটি চরিত্রকে সামনে রেখে গোটা ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, ও দুর্নীতির কাঠামোকে উন্মোচনের চেষ্টা। কারণ, বাবুর মতো বহু “ছদ্মবাদাম বিক্রেতা” আজ দেশের নানা জায়গায় প্রশাসনের ছায়ায় বসে চালাচ্ছে ক্ষমতার বাণিজ্য। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

চলবে...

Leave Your Comments