মাধ্যমিকে বিএড বৈষম্য আর কত কাল

Date: 2025-05-04
news-banner


 
শিক্ষা হলো জাতির মোরুদন্ড, যা শিক্ষকদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়, তাই জাতির মোরুদন্ড বলা হয় শিক্ষকদের। কারণটা খুবই স্পষ্ট, আজ যে শিশু কাল সে দেশের দায়িত্ববান একজন নাগরিক। দেশের সার্বিক বিকাশ দেশের নাগরিকদের শিক্ষা, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার কাধে ভর করেই সম্মুখপানে এগিয়ে চলেছে। আর এই আদর্শ নাগরিক গঠনের গুরুদায়িত্ব শিক্ষকদের উপর ন্যস্ত। একজন ভালো শিক্ষকই পারেন একজন আদর্শ শিক্ষার্থী তৈরি করতে। যারা
নিজেদের কর্মের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়নের শরিক হন। এভাবেই একজন শিক্ষকের ছোট ছোট পদক্ষেপ জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। আর এখানেই শিক্ষকের মহত্ত লুকিয়ে রয়েছে। যেহেতু শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত থাকে সামাজিক মঙ্গলসাধন। তাই শিক্ষার চালিকা শক্তিরূপে শিক্ষকরা পেয়ে থাকেন প্রভূত পদমর্যাদা। ঠিক এই কারণেই অনেকে শিক্ষকতাকে জীবনযাপনের পেশা হিসেবে বেছে নেন।
 
ব্যচেলর অফ এডুকেশন এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো (বি.এড)। কম বেশি সকলেরই জানা আছে, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য বি.এড ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। সেটা শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে হোক বা পরে। ব্যাচেলর অফ এডুকেশন (বি.এড) একটি পেশাদার ডিগ্রি। এই কোর্সের মাধ্যমে একজন শিক্ষক বা শিক্ষক হতে ইচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত শিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যার মাধ্যমে সে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করে দেশ ও জাতি গড়ার উপযুক্ত ভুমিকা রাখে।
 
একেকজন শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন, শিশু মনস্তত্ত অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এটাই মূল বৈশিষ্ট্য। এটা বোঝার সৃজনশীলতা একজন শিক্ষকের অবশ্যই থাকতে হবে। যাতে করে শিক্ষার্থীর বোঝার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে একজন শিক্ষক ক্লাসে পাঠদান সঠিকভাবে করতে পারেন। আর ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত উপলব্ধি করে বিভিন্ন উপায়ে পাঠদান করতে পারেন। এই ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার্থীর উপর ভিন্ন পাঠদানের সঠিক জ্ঞান অর্জন হয় বিএড কোর্সের মাধ্যমে। তবে মাঝে মধ্যে মনে একটা প্রশ্ন জাগে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার্থীদের ভিন্ন পাঠদানের কৌশল কি শুধুমাত্র মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষকদের জন্য প্রজোয্য নাকি মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক (স্কুল এবং কলেজ) সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রজোয্য? উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কি ভিন্ন? তাদের ভিতরে কি ভিন্নতা নাই? যদি সকলের জন্য প্রয়োজন হয় তাহলে কলেজের শিক্ষকদের জন্য বিএড না কেন? উচ্চমাধ্যমিকের পাঠদান পদ্ধতি, সিলেবাস বা ক্যারিকুলাম কি ভিন্ন? ওখানে শিক্ষার্থী অনুযায়ী মাধ্যমিকের মত শিক্ষার্থী অনুযায়ী পাঠদানের ভিন্নতা নাই? সকল শিক্ষার্থী কি সমানভাবে পাঠ গ্রহণ করতে সক্ষম? যাক সে কথা আর নাই বললাম। কিন্তু এভাবেই বৈষম্য নিয়ে চলবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষা ব্যবস্থা?
 
এবার আলোচনা করি শুধু মাধ্যমিকের একই শিক্ষা দানে বিএড বৈষম্য নিয়ে। আমাদের দেশে মাধ্যমিক লেভেলে দুই ধরনের স্কুল বিদ্যমান। ১. সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২. বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই দুই ধরনের বিদ্যালয়েই শিক্ষক হওয়ার নীতিমালা একই। সর্বনিম্ন স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে। স্কুলে যোগদানের ক্ষেত্রে বিএড বাধ্যতামূলক নয়, যদি থাকে তা হলে ভালো। তবে বেতন কাঠামো লক্ষ্য করলে আমরা এখানে দেখব একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক যোগদানের সময় থেকেই ১০ম গ্রেড অর্থাৎ ১৬,০০০/- (ষোল হাজার) টাকা স্কেলে যোগদান করে। সেক্ষেত্রে বিএড থাকা তার জন্য বাধ্যতামূলক না। পাশাপাশি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন এমপিওভূক্ত শিক্ষক একই যোগ্যতায় নিয়োগ পেলেও বিএড না থাকলে তাকে ১১তম গ্রেড তথা ১২,৫০০/- (বার হাজার পাঁচশত) টাকা বেতন স্কেলে যোগদান করতে হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য দেখার কেহ আছে কি?
 
এরপর আরো একটি শুভঙ্করের ফাঁকি হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এমপিও ভূক্তির ১০ বছর পর ১ম উচ্চতর স্কেল পাওয়ার কথা, যার মাধ্যমে ৯ম গ্রেডে পৌঁছাবে। এখানে তাকে একই স্কেলে ১০ বছর থাকতে হবে এটাই বৈষম্য। তার বিএড স্কেলের পর থেকে ১০ বছর কাউন্ট করা হয়। বিএড স্কেল নিতে যত সময় দেরি হবে ১ম উচ্চতর স্কেল পেতে তার তত দেরি হবে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যে বই, যে সিলেবাস বা যে ক্যারিকুলাম অনুসরণ করে কাজ করছেন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন (এমপিওভুক্ত) শিক্ষক একই বই, একই সিলেবাস বা ক্যারিকুলাম অনুসরণ করে কাজ করছেন। তারপরও এক বিএড বৈষম্যের কারণে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আর উচ্চ মাধ্যমিকের কথা তো আগেই বলেছি। এসকল বৈষম্য অবসানের জন্য বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আর কত কাল অপেক্ষা করতে হবে?
 
মো. সেলিমুজ্জামান
সহকারি শিক্ষক (ইংরেজি)
জামিলা খাতুন লালবাগ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়

Leave Your Comments