আব্দুল্লাহ
আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসি) লাশকাটা
ঘরে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে ঢোকানো হচ্ছে ২২ বছর বয়সী গৃহবধু ফারজানা আক্তার সুমাইয়ার
মরদেহ। “লাশকাটা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মা জাহানারা বেগম ও ৮ বছরের বড় বোন ঈশিতা নির্বাক
ভাবছে কী হচ্ছে, আর এটা কিভাবে হতে পারে! সুমাইয়ারতো এভাবে চলে যাবার কথা নয়। ওর যে
ছাবিকুন নাহার নামের ৩ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। মেয়েকে ছাড়া ও এক মুহূর্ত থাকতে
পারতো না। মা হারানো শিশুটির এখন কি হবে?” এসব ভাবনায় অসার হয়ে আসে জাহানারা ও ঈশিতার
দেহ-মন।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরের
পর সুমাইয়াকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তার সুমাইয়াকে দেখে মৃত ঘোষণা করবার
কিছু সময়ের পর। সুমাইয়াকে এদিন ঐ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন তার স্বামী রাব্বি
(২৬), শশুর নুরুল আমীন (৫৫) ও শাশুড়ি পলি বেগম (৪৮)। এর আগে তারা সুমাইয়াকে “সাফওয়ান”
নামের স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাদের কাছে সমস্যার কথা
জানতে চান। উত্তরে তারা বলেন, “হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে।” এ সময় প্রাথমিক নিরীক্ষায় সুমাইয়ার
বিপি (রক্তচাপ) ও পাল্স (নাড়ির স্পন্দন) না পাওয়া গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যাবস্থাপনায়
এ্যাম্বুলেন্স দিয়ে তাদের দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে প্রেরণ করেন বলে জানা গেছে। কিন্তু শেষ
রক্ষা হয়নি সুমাইয়ার।
জানা যায়, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানাধীন ৫৬
নং ওয়ার্ডস্থ আলীনগরের বেইলি রোড, পাকিস্তান
মসজিদ এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমীনের ছেলে রাব্বির সাথে একই এলাকার বাসিন্দা কে.এম.
কামরুজ্জামানের মেয়ে সুমাইয়ার বিগত ০৮/০৪/২০২১ খ্রি. তারিখে মুসলিম শরাহ অনুযায়ী বিবাহ
সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর সুমাইয়ার হাতে মেহেদীর রঙ শুকানোর আগেই তাদের মাঝে দাম্পত্য কলহের
শুরু হয়। সাংসারিক ছোটখাটো বিষয় নিয়ে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকতো। তুচ্ছ ঘটনাকে
কেন্দ্র করে প্রায়শই রাব্বি সুমাইয়ার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতো বলেও অভিযোগ
রয়েছে। এ নিয়ে উভয়ের পরিবারের আত্মীয়-স্বজন মিলে দু’জনার মাঝে সমঝোতা ও মিলমিশ করে
দেবার একাধিক ঘটনাও রয়েছে। এর পিছনে বড় একটি কারণ হিসেবে রাব্বির মদকাসক্তির কথা উঠে
এসেছে বার্তা বিচিত্রার সরেজমিন অনুসন্ধানে।
জানা যায়, রাব্বি নিয়মিত ইয়াবা ট্যাবলেট (মেথঅ্যাম্ফিটামিন
ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ) সেবন করতো। বাবার ৪ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটের ১
রুমে বউ নিয়ে থাকা-খাওয়ার সুযোগ হলেও মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনে জুতার দোকানে কাজ করা
রাব্বির নেশার পেছনে খরচের টাকায় ভাটা পড়তো প্রতিনিয়ত। আর তাই সে প্রায়ই স্ত্রী সুমাইয়া
এবং একমাত্র ভাসুর নায়েম জামানের কাছে টাকার জন্য হাত পাততো। সুমাইয়ার বড় বোন ঈশিতাকে
সাংসারিক বাজার-সদাই কিনে দিতে বলতো। তারাও তাদের সাধ্যমত করে আসছিল। এক সময় সুমাইয়ার
মাধ্যমে তার মা ও ভাই রাব্বির মাদকাসক্তির বিষয়টি জানতে পারেন। এই নিয়ে তাদের মধ্যকার
বিবাদমান কলহ ও সুমাইয়ার প্রতি রাব্বির নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, মা জাহানারা
বেগম সুমাইয়াকে সংসারের ইতি টেনে চলে আসতে বলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে সুমাইয়ার কন্যা ছাবিকুন
নাহার যে হাঁটি হাঁটি পা পা। এ অবস্থায় সুমাইয়া তার বড় বোন ঈশিতাকে বলে মাকে বোঝাতে
যে, “আমি সংসার ভেঙ্গে এভাবে চলে আসলে আমার মেয়ে তার মা’কে হারাবে, আর যদি মেয়েসহ চলে
আসি তাহলে মেয়েটা তার বাবাকে হারাবে। আপু, তোমরা ওকে (রাব্বি) একটু সময় দাও, ও ভালো
হয়ে যাবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু কিছুই যেন আর ঠিক হয়ে ওঠে না।
“প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েও ছোট্ট ছাবিকুনের
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যে সুমাইয়া কখনো সংসার ছাড়তে চায়নি, সেই সুমাইয়া আত্মহত্যা
করে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে পারে কিভাবে?” এই প্রতিবেদকের কাছে জিজ্ঞাসা সুমাইয়ার বোন
ঈশিতার। ঈশিতা আরো বলেন, “সুমাইয়ার মনের জোর এত বেশি ছিল যে, সে কখনোই এ কাজ করতে পারে
না।”
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুমাইয়ার স্বামী রাব্বি, শশুর
নুরুল আমীন ও শাশুড়ি পলি বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে সুমাইয়ার ভাই নায়েম জামান বাদী
হয়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় পরদিন শনিবার একটি মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর- ২১, তাং- ২৫/০১/২৫
ও পেনালকোড অনুযায়ী ৩০৬ ধারা মোতাবেক মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। এ বিষয়ে কামরাঙ্গীরচর
থানার তদন্ত অফিসার লুৎফুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে যতটুকু
জানা গেছে, সে অনুযায়ী পেনালকোডের ৩০৬ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের
রিপোর্ট ও পরবর্তী অনুসন্ধানে ঘটনার সাথে কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ৩০২ ধারায় বিজ্ঞ
আদালতে চার্জসিট প্রদান করা হবে।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই. মো. রাকিব
হোসাইনের সাথে অদ্য (৩০ জানুয়ারি) বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে মুঠোফোনে কথা হলে
তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, “প্রাথমিক তদন্তের উপর নির্ভর করে ৩০৬ ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত
হলেও ভিকটিমের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতামতসহ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পরবর্তী
অনুসন্ধানে কোনো ক্লু পাওয়া গেলে মামলাটি অন্য দিকে মোড় নিবে। মামলার তিনজন আসামীর
মধ্যে দুই জনকে ইতোমধ্যে আটক হরা হয়েছে। পালিয়ে থাকা অপর আসামী পলি বেগমকে আটকের চেষ্টা
চলছে।” এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ভিকটিমের ৩ বছরের মেয়ে ছাবিকুন নাহার রয়েছে আসামী
পলি বেগমের কাছে, সেক্ষেত্রে মেয়েটার নিরাপত্তা কতটুকু রয়েছে- এমন এক প্রশ্নের উত্তরে
পুলিশের এই অফিসার বলেন, “অবশ্যই মেয়েটাকে উদ্ধার করতে হবে। আমি ছুটিতে আছি, ১ তারিখ
(শনিবার) আমার ছুটি শেষ হবে, ছুটি শেষ হলে আমি গিয়ে তৎপরতার সাথে মেয়েটাকে রেসকিউ করে
যেভাবে নিরাপদে থাকে, সে ব্যবস্থা করা হবে।” মামলায় আলামত জব্দ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রায়
৬ ফুট লম্বা একটি সুতি কাপড়ের ওড়না জব্দ করা হয়েছে, যা ঘটনাস্থলের জানালার কাছে মেঝেতে
পড়েছিল।
জানা যায়, ঘটনার দিন বিকাল আনুমানিক পৌনে চারটার
দিকে ভিকটিম সুমাইয়ার শাশুড়ি পলি বেগম মামলার বাদী নায়েম জামানকে মুঠোফোনে কল দিয়ে
বলেন, তোমার ছোট বোনের সমস্যা হয়েছে। তিনি নায়েম জামানকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজের
জরুরী বিভাগের সামনে আসার জন্য বলে কলটি কেটে দেন। নায়েম জামান তার মা, বড় বোন ও দুলাভাইসহ
বিকাল সাড়ে চারটার দিকে জরুরী বিভাগের মর্গের সামনে উপস্থিত হয়ে দেখেন তার ছোট বোন
ভিকটিম ফারজানা আক্তার সুমাইয়া হাসপাতালের বেডের উপর মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ সময় সে
বোনের মৃত্যুর কারন জানতে চাইলে বিবাদীগণ তাকে জানায়, “তোমার বোন আত্মহত্যা করেছে।”
বিষয়টি এলাকায় ব্যপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।