নকল’ বীজের ফাঁদে ঝিনাইগাতীর কৃষক, দেড় শতাধিক চাষির সর্বনাশ

Date: 2026-04-19
news-banner

তৌহিদুর রহমান , শেরপুর  প্রতিনিধি: 

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে নকল বীজ ধান আবাদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন সদর ও নলকুড়া ইউনিয়নের প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক। উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ব্রি-৯৬ জাতের মোড়কে ভিন্ন ও নিম্নমানের বীজ সরবরাহ করায় অন্তত ৬০ থেকে ৭০ একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় ডিলারদের অতি মুনাফার লোভে সরবরাহকৃত এই নকল বীজের কারণে তাদের লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের দিঘিরপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত সবুজে ছেয়ে থাকলেও অধিকাংশ গাছে শীষ আসার লক্ষণ নেই। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে শীষ আসার কথা, সেখানে ধান গাছগুলো বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা জানান, ঝিনাইগাতী বাজারের মেসার্স নুরুল এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সাব্বির বীজ ভাণ্ডার থেকে মধুপুরের 'মিরন সিড কোম্পানি'র নামে এই বীজ কেনা হয়েছিল। কিন্তু আবাদের পর দেখা যাচ্ছে, ধান গাছে থোড় না এসে বরং ফসলি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদর ও নলকুড়া ইউনিয়নের চার-পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর জমিতে এই নকল বীজ বপন করা হয়েছে। প্রতি একরে চাষিদের খরচ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগী কৃষক আরশাদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, "ব্রি-৯৬ বীজ মনে করে ৭৫ শতক জমিতে আবাদ করেছিলাম। ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও এখন দেখছি কোনো শীষ আসছে না। আমরা গরিব মানুষ, এখন আমাদের সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে জানি না।" একই গ্রামের কৃষক নওশেদ আলী বলেন, "৭৫ শতক জমি চুক্তিতে নিয়ে ঋণ করে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। গতবার ব্রি-৯৬ লাগিয়ে লাভ হয়েছিল, তাই এবারও লাগিয়েছি। কিন্তু এখন ক্ষেত মরতে শুরু করেছে। ঋণের টাকা শোধ করার সম্বল আর অবশিষ্ট নেই।" জহুরুল ও ফরিদুল ইসলামের মতো আরও অনেক কৃষক এই জালিয়াতির কঠোর বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মেসার্স নুরুল এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরুল আমিন ও সাব্বির বীজ ভাণ্ডারের মালিক শহিদুল্লাহ বলেন, "আমরা কোম্পানির পাঠানো অনুমোদিত বীজই বিক্রি করেছি। বীজে কোনো সমস্যা থাকলে সেটা কোম্পানির দায়। কৃষকরা ঠিকমতো সার-বিষ ব্যবহার না করায় এমনটা হতে পারে।" অন্যদিকে মিরন সিড কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, বিষয়টি তারা শুনেছেন এবং মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট যে কৃষকদের ব্রি-৯৬ জাতের বদলে অন্য কোনো নিম্নমানের বীজ দেওয়া হয়েছে। আমরা দেড় শতাধিক কৃষকের অভিযোগ পেয়েছি এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে যাতে তাদের আগামী আমন মৌসুমে সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা যায়।" বর্তমানে এই বীজ জালিয়াতি নিয়ে এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অসহায় কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

Leave Your Comments