ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বরিশালের রাজনীতিতে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। জেলার ছয়টি আসনেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ঘোষণা ও মাঠে তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। এতে প্রতিটি আসনেই ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ফেব্রুয়ারিতেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার শুরু করেছে। অন্যদিকে বিএনপি ৩ নভেম্বর পাঁচটি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকেই নির্বাচনী মাঠে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার বরিশালে বিএনপি ও ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠবে।
বরিশাল–১ (গৌরনদী–আগৈলঝাড়া) এই আসনে বিএনপি প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বড় জনসভা করে প্রচার শুরু করেন।
জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রাসেল সরদার মেহেদী নিয়মিত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জহির উদ্দিন বলেন, দেশের তরুণ ভোটাররা এবার পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উন্মুখ। একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট হলে বিএনপি জয়ী হবে।
বরিশাল–২ (উজিরপুর–বানারীপাড়া) এ আসনে তৃতীয়বারের মতো বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন এস সরফুদ্দিন আহমেদ (সান্টু)। জামায়াতের প্রার্থী আবদুল মান্নান, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা নেছার উদ্দীন—তিনজনই এলাকায় প্রচারে সক্রিয়।
এ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভির সম্ভাব্য প্রার্থিতার গুঞ্জনেও রাজনীতি সরব।
বরিশাল–৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) এই আসনে এখনো বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেনি। মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে তৎপর রয়েছেন বেগম সেলিমা রহমান, জয়নুল আবেদীন ও মনিরুজ্জামান আসাদ। জামায়াতের প্রার্থী জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম প্রচারণায় বেশ এগিয়ে আছেন।
জামায়াত নেতা বাবর বলেন, বরিশালের মাঠে জামায়াত এখন শক্ত অবস্থানে আছে। তরুণ সমাজের মধ্যেও আমাদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বরিশাল–৪ (হিজলা–মেহেন্দীগঞ্জ) এ আসনে বিএনপি প্রার্থী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান।
জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবদুর জব্বার, আর ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ এছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের—তিনি চরমোনাই পীরের ছোট ভাই। তিনজনই নিয়মিত সভা-সমাবেশ, দরিদ্র সহায়তা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
বরিশাল–৫ (সদর–সিটি করপোরেশন) বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন চারবারের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (চরমোনাই পীরের ছেলে) এবং জামায়াতের প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইনও সক্রিয়ভাবে প্রচারে নেমেছেন।
মজিবর রহমান বলেন, বরিশাল বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। জনগণ এখন পরিবর্তন চায়। অন্যদিকে ফয়জুল করীম বলেন, দেশের মানুষ ইসলামি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন চায় তরুণ সমাজ।
বরিশাল–৬ (বাকেরগঞ্জ) এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন আবুল হোসেন খান। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, আর জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির নেতা এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন।
নতুন সমীকরণে বরিশালের রাজনীতিঃ বরিশালের ছয়টি আসনেই বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সক্রিয় তৎপরতায় নির্বাচনী মাঠে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোটব্যাংক বড় ভূমিকা রাখবে।
বরিশালের ভোটাররাও এবার ভিন্ন রকম এক নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সাক্ষী হতে যাচ্ছেন—যেখানে মুখোমুখি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী দুই ধারার রাজনীতি।