উকিলের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ: সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ, বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ দাবি

Date: 2025-07-06
news-banner

স্টাফ রিপোর্টার।

আইনের মানুষ হয়েও নিজেই আইন ভাঙার গুরুতর অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন ঢাকার এক অ্যাডভোকেট। পূর্বপরিচিত গ্রাহকের কাছ থেকে জোরপূর্বক কমিশন আদায় করতে না পেরে ছিনতাই ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে উকিল মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি শুধু ব্যাগ ছিনতাই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ফয়সালের অভিযোগ অনুযায়ী, ৩ জুন ২০২৫ ইং তারিখে ঢাকার জনসন রোডের স্টার কাবাব হোটেলে ফয়সালকে ফোন করে দেখা করতে বলেন উকিল জাকির। নির্ধারিত সময়ে ফয়সল তার সঙ্গী এসবি মিলনকে নিয়ে স্টার কাবাবের দ্বিতীয় তলায় উপস্থিত হলে, খাওয়া শেষে উকিল জাকির তার দলবলসহ হাজির হয়ে মনগড়া কমিশনের টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, উকিল জাকির ও তার সঙ্গে থাকা আরও দুই উকিল (এর মধ্যে একজন নারী) এবং দুই সন্ত্রাসী মিলে ফয়সালের উপর হামলা চালায়।

হামলার এক পর্যায়ে ফয়সালের কাছ থেকে তার কোরবানির গরু কেনার ও পারিবারিক ব্যয়ের ৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকাসহ ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া হয়। ব্যাগে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও ছিল। ঘটনার সময় জাকির নিজেই ব্যাগটি এক সহযোগীর হাতে তুলে দেন এবং সে পালিয়ে যায়। স্টার কাবাব হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজে পুরো ঘটনার প্রমাণ মেলে, যা পরবর্তীতে পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থা পর্যালোচনা করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে।

ফয়সাল পরদিনই সূত্রাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্তে নিয়োজিত ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ আলামিন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন এবং ঘটনার সত্যতা মেনে নেন। এমনকি উকিল জাকির স্বীকার করেন, “একটা চড় মেরেছি, কিন্তু ব্যাগ ছিল না।” তবে ভিডিও ফুটেজে ব্যাগ ছিনতাইয়ের দৃশ্য দেখা যায়।

পুলিশি তদন্তের মধ্যেই জাকির ১৯ জুন ২০২৫ তারিখে ব্যাগ ও অন্যান্য কাগজপত্র থানায় জমা দেন, তবে ছিনতাইকৃত নগদ ৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা ফেরত দেননি।

এছাড়া অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, উকিল জাকির পূর্বে কোর্টের মুহুরী ছিলেন। তার পারিবারিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। অথচ বর্তমানে তিনি ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তির মালিক। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একটি বিলের (এল-কেস নম্বর ২২/১৫-২০১৬) প্রায় ২ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকার চেকের বিপরীতে দাদা মোতালেব মাতবরের কাছ থেকে জাকির জোরপূর্বক লাখে ২৪% হারে কমিশন আদায় করেছেন।

আরও ভয়ংকর তথ্য হলো—সার্ভেয়ার মিজানুর রহমান নামে এক ভূমি অফিস কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, “উকিল জাকিরের সাথে কথা না বললে আপনারা কোনো বিল পাবেন না।” যা থেকে স্পষ্ট হয় একটি দালাল চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন উকিল জাকির।

এদিকে উকিল জাকির ফয়সালকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানিরও চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফয়সাল বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী এবং অভিযোগ রয়েছে, জাকির পূর্বে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বিএনপির বহু কর্মীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারই ছিল তার কৌশল।

এই ঘটনার পরেও সূত্রাপুর থানার ওসি কেন এখনও ব্যবস্থা নেননি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের দাবি, যেখানে সিসিটিভি ফুটেজে ছিনতাই ও মারধরের প্রমাণ রয়েছে, সেখানে জাকিরকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা উচিত ছিল।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত উকিল মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বার অ্যাসোসিয়েশন নম্বর ২০৪১০। ইতোমধ্যে গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা, ও ঢাকা বার কাউন্সিলে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগপত্র পাঠানো হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান, পুলিশ কমিশনার ও বার কাউন্সিলের নিকট।

মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকদের দাবি, “একজন আইনজীবী যখন নিজেই আইন ভাঙেন, তখন তার শাস্তি হওয়া উচিত অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ। জাকির হোসেনের বার কাউন্সিলের সনদ বাতিল এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

Leave Your Comments