সোবাহান-আয়নালের ‘দলিল সাম্রাজ্য’ এখন রাষ্ট্রের উপর চাপা দুর্বৃত্তশক্তি

Date: 2025-06-26
news-banner

নিজস্ব প্রতিনিধি:


মামা-ভাগনে গিলে খাচ্ছে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস | পর্ব-০৩


প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে দুঃশ্চিন্তা নয়, বরং আতঙ্কে কাঁপছে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ‘মামা-ভাগনে সিন্ডিকেট’। সাংবাদিকতা যখন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, তখন দুর্বৃত্তদের প্রলয়ঙ্করী রূপ উন্মোচিত হয়—আর সেই নগ্ন বাস্তবতার নাম আজ ‘সোবাহান রাজ’।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পর বার্তা বিচিত্রার কক্ষে এসেছিল অদৃশ্য ফোন, ছদ্মবেশী ভয়, তদবিরি তৎপরতা, এমনকি হুমকি পর্যন্ত। কিছু নামধারী সাংবাদিক যেন নিজেদের কলম বন্ধক রেখে সোবাহানের হয়ে মাঠে নেমেছে। যারা পত্রিকা হাতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছাতে চেয়েছে, তাদের উপর চালানো হয়েছে পেশাদার হামলা। অফিস চত্বরে সোবাহানের লোকজন দম্ভভরে ঘোষণা করেছে—“এই রিপোর্ট বন্ধ না করলে এবার সাংবাদিকদেরও গায়েব করে দেওয়া হবে!”

এটাই মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বাস্তবতা—এটা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এখন সোবাহান-আয়নালের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি দুর্নীতির ‘ডিপার্টমেন্টাল মাফিয়া হাব’। এখানে নিয়ম মানা হয় না, বরং নিয়ম তৈরি হয় সোবাহানের গার্ডরুমে বসে, যেখানে রাতের আঁধারে ‘স্ট্যাম্প পলিসি’, ‘চা-নাশতা ফি’, এবং ‘দলিল প্রবেশ ফি’ নির্ধারণ করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর এক চিত্র—রাত ১টার পর রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত ‘অফ দ্য রেকর্ড’ প্রবেশ করেন সোবাহান ও তার ভাগ্নে আয়নাল। তাদের সঙ্গে থাকে কয়েকজন বিশেষ দালাল, যাদের কাজ হলো পুরোনো দলিলের পৃষ্ঠাগুলোর অদলবদল করে নতুন মালিক বানিয়ে দেওয়া। এই কাজ চলাকালে অফিসে কোনো বৈধ কর্মচারী থাকেন না—থাকে শুধু ‘সোবাহানের কর্মী বাহিনী’, যারা নথি ঘাঁটে, কাগজ চুরি করে বাইরে পাচার করে, এমনকি হার্ডড্রাইভ পর্যন্ত ‘ক্লিন’ করে দেয় যেন কোনো প্রমাণ না থাকে।

সোবাহানের সিন্ডিকেটের মূল শক্তি হলো তার ‘ফেক কনফিডেন্স’। একাধিক জমির রেকর্ড ঘাঁটিয়ে ‘নতুন দলিল বানানো’, ‘নামজারি জালিয়াতি’, এমনকি মৃত মালিকের নামেও দলিল তৈরি করা—এসব আজ যেন রুটিন ওয়ার্ক। কোনো গ্রাহক যদি তার জমির কাগজ আনতে চায়, এবং সোবাহানের ‘চা-নাশতা ফান্ডে’ টাকা না দেয়, তাহলে সেই কাগজ অফিসেই ‘মিসিং ফাইল’ হয়ে যায়। অথচ যারা টাকা দেয়, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব রেডি ডকুমেন্ট হাতে পায়।

এটি কেবল দুর্নীতি নয়, এটা রাষ্ট্রের মালিকানা ও জনগণের অধিকার বিক্রির অবলীলায় পরিচালিত চক্রান্ত। দেশের আইন যেখানে সম্পদের সুরক্ষা দেয়, সেখানে সোবহান ও আয়নালের হাতে সেই আইন পরিণত হয়েছে ‘জাল সনদ তৈরির অস্ত্রে’।



প্রশ্ন উঠেছে—এই দুর্নীতির প্রতিবেদন একাধিকবার প্রকাশিত হওয়ার পরও কেন এখনো কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? দুদক তদন্তে এলেও তা এখন ‘ফাইলিয়াসিসে’ আক্রান্ত, অর্থাৎ নড়ছে না। বরং সূত্র জানায়, সোবহান কিছু প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় এতটাই নিরাপদ, যে একবার তদন্ত শুরু হলে সেই কর্মকর্তার বদলি নিশ্চিত।

নতুন এক দলিলগ্রহীতার অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, তিনি যখন দলিল নিয়ে অফিসে যান, তখন তার কাছে সরাসরি টাকা দাবি করা হয়। না দিলে তার কাগজ আটকে দেওয়া হয়। পরে দেখা যায়, একই জমির উপর ছোবাহানের সিন্ডিকেট অন্য এক দলিল তৈরি করে দিয়েছে। প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়—“এটা সোবাহানের এলাকা, এখানে সরকারি নিয়ম চলে না।”

গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেট শুধু মোহাম্মদপুরে সীমাবদ্ধ নয়। ছোবাহানের লোকজন পুরান ঢাকার আরও কয়েকটি রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত ঘোরাফেরা করে। এমনকি কিছু ‘সিস্টেম ডেভেলপার’ এর মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেসেও গোপন পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যা ঘটছে তা শুধু দালালি নয়—এটা পূর্ণমাত্রার রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির মডেল। যদি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এখনই আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে ভূমি অফিসগুলো হয়ে উঠবে চরম দুর্নীতির মেট্রো স্টেশন, যেখানে জনগণের মালিকানা থাকবে কিছু পিশাচের কব্জায়।

সোবাহান-আয়নাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যদি এখনো নীরব থাকে, তবে এ দায় শুধু মন্ত্রকের নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার।

চলবে...

Leave Your Comments