মোহাম্মদ রনিঃ
ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়নি। তাই সরাসরি "কে জয়ী হলো" এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে সম্প্রতি ইরানের সরাসরি ইসরাইল আক্রমণ এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করে প্রতিটি পক্ষের কৌশলগত লাভ-ক্ষতি বিচার করা যেতে পারে। এই ঘটনাটিকে একটি বড় আকারের যুদ্ধের পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত সামরিক উত্তেজনা বা শক্তির মহড়া বলা যেতে পারে।
আসুন প্রতিটি পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি:
ইরানের অর্জন (তারা নিজেদের বিজয়ী মনে করতে পারে)
সরাসরি আক্রমণের সাহসিকতা: ইরান এই প্রথমবার নিজের মাটি থেকে সরাসরি ইসরাইলের উপর এত বড় আকারের হামলা চালিয়েছে। এটি তাদের দীর্ঘদিনের "ছায়াযুদ্ধ" (proxy war) থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় পদক্ষেপ এবং একে তারা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখছে।
প্রতিশোধ গ্রহণ: দামেস্কে তাদের কনস্যুলেটে ইসরাইলি হামলার পর ইরান প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের দেশের অভ্যন্তরে এবং মিত্রদের কাছে তাদের সম্মান রক্ষা করেছে।
সক্ষমতার প্রদর্শন: শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। যদিও বেশিরভাগই ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু হামলার ব্যাপকতা সবার জন্য একটি বার্তা ছিল।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন (তারা নিজেদের বিজয়ী মনে করতে পারে)
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চূড়ান্ত সফলতা: ইসরাইল তাদের আয়রন ডোম (Iron Dome), অ্যারো (Arrow) এবং ডেভিডস স্লিং (David's Sling) এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৯৯% ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। এটি তাদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক বিশাল বিজ্ঞাপন।
আন্তর্জাতিক জোটের সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং এমনকি জর্ডানের মতো আরব দেশের সক্রিয় সাহায্যে এই প্রতিরক্ষা সম্ভব হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বিপদের সময় ইসরাইল একা নয় এবং তাদের শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে।
যুদ্ধ এড়ানো এবং নিয়ন্ত্রিত জবাব: যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে একটি বড় আকারের যুদ্ধ এড়াতে পেরেছে। ইসরাইলও ইরানের হামলার জবাবে একটি সীমিত ও কৌশলগত পাল্টা হামলা চালিয়েছে (যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি), যা প্রমাণ করে যে তারা ইরানের ভেতরেও আঘাত হানতে পারে কিন্তু পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চায়নি। একে একটি সংযত কিন্তু শক্তিশালী জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপ: কে জয়ী হলো?
এই ঘটনায় কোনো একক পক্ষকে নিরঙ্কুশ "জয়ী" বলা যায় না। এটি একটি জটিল দাবার চালের মতো ছিল, যেখানে প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী কিছু সাফল্য পেয়েছে।
ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা ইসরাইলকে সরাসরি আঘাত করার ক্ষমতা ও সাহস রাখে।
ইসরাইল প্রমাণ করেছে যে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় দুর্ভেদ্য এবং তাদের পাশে শক্তিশালী মিত্ররা আছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ থামাতে পেরেছে এবং তার মিত্রকে রক্ষা করার ক্ষমতা দেখিয়েছে।
সুতরাং, বলা যেতে পারে যে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরাইল ও তার মিত্ররা স্পষ্টভাবে বিজয়ী, কারণ তারা হামলাটি প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে ইরানও নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারে, কারণ তারা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়ে তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।
এই ঘটনাটি তাদের দীর্ঘদিনের সংঘাতের একটি নতুন অধ্যায় মাত্র এবং কেউই চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়নি।