নিজস্ব প্রতিনিধি:
ঢাকার মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যে একপ্রকার “ছায়া প্রশাসন” চালু রয়েছে, তা এখন কোনো গুঞ্জন নয়—এটা বাস্তব, এবং এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ‘উমেদার’ নামের অনিয়মের প্রতিমূর্তি—আব্দুল ছোবান। গত পর্বে প্রকাশিত তথ্য যেন ছিল বরফের চূড়া, এবার ভেতরের গভীরতা বুঝলে গা শিউরে ওঠে। ভূমি অফিসকে নিজের ব্যক্তিগত লুটের আখড়ায় রূপান্তর করে ফেলেছেন এই ব্যক্তি, যার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আইনের মুখে থুতু ছুঁড়ে দেওয়া।
ছোবান অফিসে যা করছেন, তা কোনো অপরাধ নয়—পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারিত্ব। সরকারি দলিল ঘেঁষার নামে রাতভর চলে জালিয়াতির মহোৎসব। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ‘ভূতের অফিসে’ পরিণত হয়—তবে ভূত নয়, প্রবেশ করেন ছোবান ও তার ভায়রা-ভাগ্নে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। রাতের আঁধারে পুরোনো দলিল পাল্টে নতুন দাগ বসানো, একই জমি একাধিক ব্যক্তির নামে দলিল তৈরি, কিংবা আসল দলিলের বদলে নকল কাগজ তৈরি—এসব যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এ এক ধরনের ‘দলিল কারখানা’ যেখানে মূল্যবান জমির ইতিহাস রাতারাতি বদলে ফেলা হয়।
এই ‘রাতের কারিগর’দের মূল সেনাপতি আয়নাল হোসেন—ছোবানের ভাগ্নে, যার সরকারি কোনো পদ নেই, নেই নিয়োগপত্র, নেই কোনো দায়দায়িত্ব। তবু তিনিই অফিসের তালা খোলেন, নথি ঘাঁটেন, আর ফাইল চুরি করে বাইরে পাচার করেন। সরকারি নথি যে কত সহজে বিক্রি হয়, তা মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এসে দেখা যায়। এমনকি দালালদের কাছে দলিল ‘প্রিপেয়ারিং’ করতে হলে ছোবান সিন্ডিকেটকে চাঁদা না দিলে কোনো কাজ হয় না। যারা ঘুষ দেয় না, তাদের ফাইল বছরের পর বছর ধুলায় পড়ে থাকে। অথচ যারা ‘সিস্টেমে চা-নাশতা’ দেয়, তাদের দলিল এক ঘণ্টার মধ্যেই পেয়ে যায় ‘খাসি স্ট্যাম্পে ভাজা’।
দুদক তদন্ত শুরুর পর কিছু নথি সরানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ছোবান জানেন, কোথায় কী লিখে রাখতে হয়, আবার কিভাবে ফাইল হারিয়ে ফেললে তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা যায়। তার স্ত্রীর নামে যে মিনিবাস ও ইজিবাইক রেজিস্ট্রেশন রয়েছে, তা কোনোভাবেই তার সরকারি চাকরির আয় দিয়ে সম্ভব নয়। আয়কর নথিতে এখনো সম্পদের অর্ধেক গোপন রাখা হয়েছে। অথচ বাস্তবে তিনি সরকারি জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত অফিস বানিয়ে ফেলেছেন। এলাকাবাসী জানায়, বছিলা ও দক্ষিণখানে তার দখলে থাকা জমির একটি বড় অংশ সরকারি খাস জমি, যার দলিল ‘গায়েবি তারিখে’ রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মচারী, যাদের কাজ ছিল দলিল যাচাই, তারাও এখন ছোবানের ‘মাসিক খোরাকি’ খায়। এ এক নিখুঁত মাফিয়া কন্ট্রোল—যেখানে কোনো আইন নেই, নীতি নেই, থাকে শুধু ছোবান-নীতির ‘মার্কেট রেট’। এমনও দেখা গেছে, একাধিক ফ্ল্যাটের ক্রয় দলিলে জাল স্বাক্ষর দিয়ে বিদেশে থাকা মালিকদের সম্পদ হস্তান্তর করে দিয়েছে তার সিন্ডিকেট। আদালতে মামলা ঠেকাতে ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করাও তাদের আরেকটি ‘সেবা প্যাকেজ’।
এই সিন্ডিকেট শুধু ঘুষ খাচ্ছে না, তারা সরকারের নথি জাল করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে বিক্রি করে দিচ্ছে। ছোবানের এমন অবাধ কর্তৃত্বে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সততার সঙ্গে কাজ করতে চাওয়া রেজিস্ট্রাররাও আতঙ্কিত। এক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, “ছোবানের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে রাতের বেলা লোকজন এসে বাসায় হুমকি দেয়। ওদের প্রভাব এতটাই বেশি যে অনেক সময় উল্টো আমাদের বদলি করে দেওয়া হয়।”
দুদকের তদন্তও যেন চলছে কচ্ছপগতিতে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ফাঁস হয়েছে, কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির ছায়ায় সে এত বছর বেঁচে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে—কেন এত প্রমাণ থাকার পরেও ছোবানকে গ্রেপ্তার করা হয়নি? কেন তার জালিয়াতি তদন্ত করতে গিয়ে নথি গায়েব হয়ে যায়?
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন ঘুষের হটস্পট, নকলের ঘাঁটি, আর ছোবান-আয়নালের ব্যক্তিগত কোম্পানি। এটা শুধু দুর্নীতি নয়—এটা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। এসব অপরাধী যদি রেহাই পায়, তাহলে ভূমি অফিসগুলো হয়ে উঠবে আরও ভয়ঙ্কর, সৎ অফিসাররা হবে বিরল, আর জনগণের সম্পদ থাকবে লুটেরাদের কব্জায়।
চলবে...