হাজী আলাউদ্দিনের ছত্রছায়ায় দুর্নীতির জাল: কে আড়াল করছে এই সাম্রাজ্যকে? প্রশাসন, দলীয় নেতাকর্মী ও মিডিয়া—সবারই কেন রহস্যজনক নীরবতা

Date: 2025-06-24
news-banner

ঢাকা ও ফেনী প্রতিনিধি

ফেনীর সাবেক মেয়র হাজী আলাউদ্দিনকে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রথম পর্বে উঠে এসেছিল তার ক্ষমতার অপব্যবহার, একচেটিয়া পরিবহন ব্যবসা, জমি দখল ও একাধিক হত্যা মামলার অভিযোগ। দ্বিতীয় পর্বে আমরা অনুসন্ধান করেছি—কীভাবে প্রশাসনিক ছত্রছায়া, রাজনৈতিক সুবিধাভোগ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি তার অপরাধ ও দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

ক্ষমতার ছাতা আর প্রশাসনের নীরবতা—দুইয়ে মিলে অবাধ অপরাধচক্র

ফেনী জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সব পর্যায়েই হাজী আলাউদ্দিনের দাপট স্পষ্ট। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলেই উপরমহল থেকে “বিশেষ অনুরোধ” আসে। ফলে মামলা থাকলেও গ্রেফতার নেই, তদন্ত হয়েও চার্জশিট হয় না—মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো চুক্তিতে সবকিছু আটকে আছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার থানায় দায়ের করা ৭ ও ৮ নম্বর মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। অভিযোগকারীরা একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো অগ্রগতি দেখতে পাননি। নিহত বাবুল মিয়ার পরিবারের অভিযোগ—‘অপরাধীর পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, বিচার নয়।’


হাজী আলাউদ্দিনের পরিবহন সাম্রাজ্য শুধুই ব্যবসা নয়—এ যেন এক সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার ভাই জাফর উদ্দিন সরাসরি গাড়িগুলো পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। স্টার লাইন পরিবহনের সুপারভাইজার থেকে শুরু করে সাধারণ ড্রাইভারদের সামান্য ভুলেও টেনে নেওয়া হয় ‘টর্চার সেল’-এ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ড্রাইভার সাংবাদিক দের  জানান, “জাফর ভাইয়ের কথার বাইরে গেলেই ধরে নিয়ে যায় এক ঘরে। ওখানে শুধু চড়-থাপ্পড় না, কিক-লাথি, গালি, হুমকি—সবই চলে। ওটা টর্চার সেল, ওখানে যাওয়া মানে দুঃস্বপ্ন।”



এই ঘৃণ্য নির্যাতনের ঘটনা বহু চালক-কর্মীর মানসিক ভয় ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কেউ মুখ খুলতে পারে না—ভয়ের রাজত্বে কথা বলাও যেন অপরাধ।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত—সবস্তরেই হাজী আলাউদ্দিনের প্রভাব। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তার একাধিক ছবিও ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এই সম্পর্কগুলোই তাকে রাজনৈতিক 'রক্ষাকবচ' দিয়েছে বলে মনে করছে ফেনীর রাজনৈতিক মহল। স্থানীয় পর্যায়ে নিজাম উদ্দিন হাজারীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্যতাও তাকে ফেনীতে ‘অদৃশ্য মেয়র’ হিসেবে সক্রিয় রেখেছে।

হাজী আলাউদ্দিন শুধু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নয়—মিডিয়া ক্ষেত্রেও তৈরি করেছেন নিজস্ব বলয়। দুইটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই যেন প্রচারে না আসে—তা নিশ্চিত করেছেন। স্টার লাইন পরিবহনের বিজ্ঞাপনের বিপরীতে অসংখ্য স্থানীয় সংবাদপত্র ‘নীরবতা কেনার’ পথেই হাঁটছে।

একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, হাজী আলাউদ্দিন সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফোনে হুমকি ও অর্থ প্রস্তাব দুইই পেয়েছেন। একজন প্রতিবেদক বলেন, “তার বিরুদ্ধে লেখার মানে হলো নিজের চাকরি নিয়ে ঝুঁকিতে পড়া। স্থানীয় সম্পাদকরাও তাকে ভয় পায়।”

জানা গেছে, হাজী আলাউদ্দিন সম্প্রতি ফেনীতে ১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জমির দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করিয়েছেন। ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রি অফিসে এই জালিয়াতির ঘটনায় ‘ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে’ বলা হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি।

এছাড়াও, 'স্টার লাইন গ্রুপ'-এর আড়ালে স্থাপন করেছেন অদৃশ্য আর্থিক সিন্ডিকেট, যেখান থেকে রাজনীতি ও প্রশাসনে ‘বিশেষ বরাদ্দ’ যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।বিস্তারিত পরবর্তী সংখ্যায়।

Leave Your Comments