রাস্তা নয়, যেন ইউনিক পরিবহনের ব্যক্তিগত গ্যারেজ!

Date: 2025-06-23
news-banner


স্টাফ রিপোর্টার



রাজধানীর মুগদা টিটি পাড়া সড়ক এখন আর জনগণের রাস্তা নয়—এ যেন এক শ্রেণির পরিবহন ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত দখলদারিত্বের এলাকা! বছরের পর বছর ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি অবৈধভাবে দখল করে জনদুর্ভোগে ফেলে দিয়েছে ইউনিক পরিবহনসহ কয়েকটি স্বার্থান্ধ পরিবহন মালিকচক্র। বৌদ্ধ মন্দির থেকে শুরু করে সায়েদাবাদ পর্যন্ত পুরো সড়কের দুই পাশে যত্রতত্রভাবে গড়ে উঠেছে বেআইনি পার্কিং পয়েন্ট, যা জনস্বার্থের গলাগুঁটি চেপে ধরেছে দিনের পর দিন।

সরাসরি গিয়ে দেখা যায়, ইউনিক পরিবহন মালিকপক্ষ নিজেরা যতটুকু জায়গা ক্রয় করেছে, তাতে একটিমাত্র কাউন্টার দাঁড় করানোর পর আর কোনো আইনি জায়গা তাদের নেই। অথচ তারা কার্যত গোটা রাস্তাকে নিজের টার্মিনাল বানিয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের মূল্যবান সরকারি সম্পত্তিও বেহায়ার মতো দখলে রেখেছে তারা। কোনো অনুমতি নেই, কোনো টেন্ডার নেই—তবু চলছে রমরমা পরিবহন বাণিজ্য!

সড়কে চলাচলকারী মানুষের ভাষায়, ‘রাস্তাটার এখন নাম হওয়া উচিত ইউনিক স্ট্যান্ড, এখানে জনগণের কোনো অধিকার নাই।’ রাস্তায় পার্কিং করা বাসগুলোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস তো দূরের কথা, স্কুলগামী শিশু কিংবা কর্মজীবী মানুষ—কারও চলাচলই স্বাভাবিক নেই। অথচ আইন আছে, ট্রাফিক আছে, নগর কর্তৃপক্ষ আছে—কিন্তু নেই কোনো নজরদারি কিংবা ব্যবস্থা।

ইউনিক পরিবহনের পাশাপাশি একুশে পরিবহন, হিমাচল, ড্রিম লাইন, স্টার লাইন, লাল সবুজ পরিবহন—সবাই মিলে রীতিমতো একটি ‘পার্কিং সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছে। ঢাকা-ফেনী, ঢাকা-লক্ষ্মীপুর, ঢাকা-নোয়াখালী কিংবা বসুরহাট রোডের এসব গাড়ি নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড বাদ দিয়ে টিটি পাড়া সড়ককেই নিয়মিতভাবে নিজেদের টার্মিনাল বানিয়ে ফেলেছে।

এ যেন ক্ষমতার দাপট আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার এক ভয়ংকর যৌথ উৎপাদন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এতকিছু দেখেও স্থানীয় প্রশাসন নির্বিকার। সবুজবাগ জোনের ট্রাফিক বিভাগ যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এলাকা ভিত্তিক প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়ায় দিনের আলোতে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

এখানেই শেষ নয়—রেলওয়ের জমি দখলের বিষয়টি আরও ভয়াবহ। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে গায়ের জোরে টার্মিনাল বানিয়ে বসে থাকা এই পরিবহন চক্রের বিরুদ্ধে কেন কোনো মামলা বা উচ্ছেদ অভিযান নেই—সে প্রশ্ন আজ শুধু এলাকাবাসীর নয়, সমগ্র নগরবাসীর।

জনস্বার্থকে থোড়াই কেয়ার করা এই দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরেই এই রাস্তা কেবল যানজটের নয়—জনরোষের বিস্ফোরণের এক আতঙ্কজনক উদাহরণ হয়ে উঠবে। রাজধানীর বুকে এমন দখলদারিত্ব যদি প্রকাশ্যে, নির্লজ্জভাবে চলতে পারে, তবে সরকারের আইন, সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ববোধ ও ট্রাফিক বিভাগের উপস্থিতির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

ঢাকা শহরের প্রতিটি ইঞ্চি জমি এখন মূল্যবান—তাতে জনগণের হাঁটার জায়গাটুকুও কেড়ে নিচ্ছে কিছু ‘বাহনপুষ্ট দানব’! সময় এসেছে এমন দখলদার মানসিকতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জনদাবিকে কেন্দ্রীভূত করার। ইউনিকসহ অন্যান্য অবৈধ দখলদার পরিবহন কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হোক—এটাই এখন জনআকাঙ্ক্ষা।

মুগদা টিটি পাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে কথা বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই সড়ক আর কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। রাস্তা, ফুটপাত, এমনকি বাসাবাড়ির সামনের জায়গাটুকুও দখলে নিয়েছে ইউনিকসহ পরিবহন চক্রের বড় বড় বাস। এলাকার মানুষ চুপ করে থাকেনি, কথা বলেছে, ক্ষোভ ঝেড়েছে, অভিজ্ঞতা শোনিয়েছে।

একজন মুদি দোকানি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড়ায়, মানুষ দোকানে ঢুকতেই পারে না। বললেই হেল্পাররা বলে, ‘চুপ থাকেন, বেশি বললে একে নিয়ে যাবে!’ আমরা কার কাছে বিচার চাইব? পুলিশের কাছে গেলে তারা বলে, ‘উপরের নির্দেশ না এলে কিছু করতে পারবো না।’ তাহলে আমরা কি বস্তিতে থাকি?”

রাবেয়া সুলতানা নামে এক শিক্ষিকা বললেন, “সকালবেলা মেয়ে নিয়ে বের হই, কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে পার হওয়া দুঃস্বপ্ন। গাড়ির ধোঁয়া, হেল্পারদের গালাগালি, রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া—এই কি রাজধানী ঢাকা? একটা শহরে যদি মায়ের নিরাপত্তা না থাকে, শিশুদের চলাচল না থাকে, তাহলে সেটাকে শহর বলা যায়?”

রিকশাচালক আবু তালেব জানালেন, “দেখেন ভাই, আমরা রিকশা চালিয়ে খাই, কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে চালানোই যায় না। ইউনিকের গাড়ি গুলো যেন রাস্তার মাঝখানে সারি সারি করে দাড়ানো একটুও জায়গা রাখে না। ট্রাফিক আসে, দুইটা হুইসেল দেয়, আবার চলে যায়। সব ম্যানেজ করা গরীব মানুষের গায়ের রক্ত দিয়াই ওরা তেল খায়!”

এলাকারই নবম শ্রেণির ছাত্র রুমান হোসেন বলল, “স্কুলে দেরি হয় রোজ। একদিন এক হেল্পার বাজে কথা বলছিল, আমি ভয় পাই মা এখন আমাকে স্কুলে দিয়ে আসে। এটা কি শিশুদের শহর? বাসের হেল্পারদের ভয়ে চলতে হয়?”

চাকরিজীবী সুলতান মাহমুদ জানান, “প্রতিদিন অফিসে যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। অথচ গাড়ি না থাকলে ২৫ মিনিটেই চলে যেতাম এই রাস্তার কারণে ট্রাফিক জ্যাম হয় পুরা মুগদা-মালিবাগ রোডে আর ট্রাফিক পুলিশ? তারা দাঁড়ায়, মোবাইলে কথা বলে, চলে যায়। তাদের কাছে জনগণ গোনার কিছু না। যারা গাড়ি চালায়, তারাই এখন রাস্তা চালায়।”

ফিরোজা খাতুন, এক গৃহবধূ, অভিযোগ করলেন, “বাসা থেকে বের হতেই ভয় লাগে। বাসের হেল্পাররা সারাক্ষণ ধমকাধমকি করে, ছেলেপেলে এসব দেখে বড় হচ্ছে। আমাদের গেটের সামনে পর্যন্ত গাড়ি ঠেলে দেয়। কোথাও যাওয়া যায় না, কেউ আসতেও পারে না। আত্মীয়-স্বজন দাওয়াত দিলে  বলে ‘ওইখানে তো গাড়ি রাখে, যাবো কেমনে?’”

একটি স্থানীয় ফার্মেসির মালিক মো. সাকিব বললেন, “একবার একজন বুড়ো মানুষকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসছিল, অ্যাম্বুলেন্স ২৫ মিনিট আটকে ছিল বাসের কারণে। আমি নিজের চোখে দেখেছি লোকটা গাড়ির ভেতরে অচেতন হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে চালক বলে—‘ভাই, কী করবো বলেন, সামনে ইউনিকের বাস  সরাইবো কে?’ রাস্তাটা যদি অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের উপযোগী না হয়, তাহলে কার জন্য এই সড়ক?”

এক বৃদ্ধ বলেন, “মরে গেলেও মনে হয় এই রাস্তায় নামাজে জানাজা করবো না। জানাজার সময় গাড়ি চলবে, হেল্পার গালি দেবে—এটাই মুগদার বাস্তবতা। এই রাস্তা ইউনিকের, জনগণের না!”

এইসব কথা শুধু ক্ষুব্ধ মানুষের সংলাপ নয়, বরং একেকটি ব্যর্থ রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার জ্বলন্ত দলিল। জনগণের কান্না, ক্ষোভ আর তাচ্ছিল্য আজ যেন ব্যর্থ প্রশাসনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে মুগদার এই রাস্তায়। আর কতদিন?—এই প্রশ্ন এখন শুধু মুগদাবাসীর নয়, সারা ঢাকার। বিস্তারিত পরবর্তী সংখ্যায় চোখ রাখুন বার্তা বিচিত্রায়।

Leave Your Comments