নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসন কাঠামোয় কিছু কর্মকর্তা আজও রয়েছেন, যাঁরা নিয়মতান্ত্রিকতার নির্যাস রক্ষা করেই গতিশীল প্রশাসনের চাকা সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন। পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক শাহরিয়ার নাজির ঠিক তেমনই এক রাষ্ট্রকর্মচারী, যিনি জনপ্রশাসনের বিবেক, বাস্তবতা এবং জবাবদিহিতার দৃষ্টান্তরূপেই বহাল আছেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা নিছক তথ্যগত অপব্যাখ্যা ও অপসাংবাদিকতার কুৎসিত কুশলতায় আচ্ছন্ন, যার পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক ঈর্ষা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্ররোচনার ছায়া লক্ষণীয়।
বলা হয়েছে, পৌর প্রশাসকের কক্ষ ও কনফারেন্স রুমে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল দরপত্র আহ্বানের আগেই। অথচ বিস্ময়ের বিষয় এই যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ডিরেক্ট পারচেজ পদ্ধতির আওতায় স্বল্পপরিসরে কাজ শুরুর প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও, পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়ার আওতায় যাওয়ার সুদৃঢ় নির্দেশনা দেন শাহরিয়ার নাজির নিজেই। অর্থাৎ, প্রকল্পের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কাজ বন্ধ করে দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিয়মতান্ত্রিকতার পথে ফিরিয়ে আনেন তিনি। এ এক অনন্য প্রশাসনিক আত্মনিয়ন্ত্রণ—যা বর্তমান আমলাতান্ত্রিক জগতে এক কথায় বিরল।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন—দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সচল রয়েছে। এর পরেও যাঁরা দৃষ্টিপাত করছেন ‘অনিয়ম’ নামক শব্দটি দিয়ে, তাঁদের উদ্দেশ্য, প্রণোদনা ও প্রভু-পরিচিতি খতিয়ে দেখা একান্ত প্রয়োজন।
অবশ্য অভিযোগকারীদের আরেকটি প্রবল চেষ্টা ছিল বোদা নগরকমারী হাটের ইজারা ঘিরে ‘অনিয়ম’ আখ্যা লাগানো। যেখানে বাস্তবতা হলো—উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দরদাতাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অযৌক্তিক প্রলেপ দিয়ে, ব্যক্তিগত বিরোধের প্রতিশোধ নিতে প্রশাসনকে নতজানু করার এহেন প্রয়াস সরাসরি রাষ্ট্রব্যবস্থার সুনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাকে আঘাত করার নামান্তর।
সচেতন নাগরিকমাত্রই জানেন, সরকারি প্রকল্পে টেন্ডার ছাড়াও কিছু নির্ধারিত সীমার মধ্যে ডিরেক্ট পারচেজ পদ্ধতিতে কাজ করার বিধান রয়েছে। কাজটি যখন শুরু হয়, তখন ছিল সেটিই প্রস্তাবনা। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সেটি স্থগিত রেখে টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া—এটি কোনো অনিয়ম নয়, বরং নীতিনিষ্ঠ প্রশাসনিক বিবেকের বলিষ্ঠ উচ্চারণ। একে যদি অনিয়ম বলা হয়, তাহলে সততার সংজ্ঞা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক শুরু করতে হবে।
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক নিজেই বলেছেন—সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের আগে অভিযোগের ভিত্তিতে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। অর্থাৎ, সরকারি খাতে কোনো ক্ষতি না করে, একটি দপ্তরের কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে সীমিত আকারে নেয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যে ‘উচ্চস্বরে অভিযোগ’ তুলে ধরা হচ্ছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে বিভ্রান্তিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রসূত।
আমরা দেখেছি—জনগণের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা কর্মকর্তারা প্রায়শই ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা ছড়িয়ে একটি গোষ্ঠী নিজ স্বার্থসিদ্ধি করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বোদায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। স্থানীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের সুযোগে, স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কালিমালিপ্ত করে তোলার যে কুশিল্প চলছে, তা এক ভয়ঙ্কর নজির।
এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রশ্ন—যদি প্রশাসনের মধ্যে সাহস, সততা ও সময়জ্ঞানই আক্রমণের শিকার হয়, তবে উন্নয়ন কীভাবে অব্যাহত থাকবে? স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী যদি একজন নিবেদিতপ্রাণ ইউএনও-কে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যকর রাখার আশাও বিলীন হয়ে যাবে।
আমরা মনে করি, বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহরিয়ার নাজিরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তসাপেক্ষে মিথ্যা প্রমাণিত হবে এবং এই তরুণ প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাহসিকতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকার আরও দৃঢ় হবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।